বিশ্বের নানা প্রান্তে ঈদের চাঁদ উঠলেও সবখানে সেই চাঁদ সমান আনন্দ বয়ে আনে না—এই চিরন্তন সত্য আজ আরও নির্মমভাবে দৃশ্যমান। ২০২০-এর দশকের শেষভাগে এসে পৃথিবীর ভূ-রাজনীতি, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মানবিক সংকট এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে ঈদের আনন্দ অনেক জায়গায় হয়ে উঠেছে বেদনা, ধৈর্য এবং প্রতিরোধের প্রতীক। ঈদ এখন শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বিশ্বের মুসলিম সমাজের বাস্তবতার আয়নাও বটে।
ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে ঈদের আগমন যেন এক বেদনাহত বিরতি। বিধ্বস্ত শহর, ধ্বংসস্তূপে পরিণত ঘরবাড়ি এবং প্রতিনিয়ত প্রাণহানির খবর—এই বাস্তবতার মাঝেই ধ্বনিত হয় তাকবীর। শিশুদের হাতে খেলনার বদলে ধরা পড়ে অনিশ্চয়তা; অনেকেই হারিয়েছে বাবা-মা, ভাই-বোন। তবুও তারা ঈদের নামাজে দাঁড়ায়, কারণ তাদের কাছে ঈদ মানে শুধু আনন্দ নয়—এটি বেঁচে থাকার ঘোষণা, অস্তিত্বের সংগ্রাম এবং আশার শেষ আলো।
বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতেও ঈদের চিত্র খুব বেশি আলাদা নয়। মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসা, খাদ্যসংকট এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ঈদের দিনে সামান্য খাবার বা একটি নতুন কাপড় তাদের কাছে বিলাসিতা নয়, বরং আশার প্রতীক। কিন্তু তাদের অন্তরের গভীরে একটাই আকাঙ্ক্ষা—নিজ ভূমিতে সম্মানের সঙ্গে ফিরে গিয়ে ঈদ উদযাপন করা।
ইরান আজ এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। আঞ্চলিক সংঘাত, সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনা এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ের যুদ্ধ-সংকট ও ভূরাজনৈতিক চাপ ইরানের মানুষের মনে এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক তৈরি করেছে। ঈদের সময়ও সেই চাপ থেকে মুক্তি মেলে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক চাপের কারণে অনেক পরিবার সীমিত আয়োজনেই ঈদ পালন করতে বাধ্য হয়। তবুও তাদের ঈদ নিছক উৎসব নয়—এটি ধৈর্যের এক নীরব ঘোষণা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানবিক স্থিতিস্থাপকতার প্রতিচ্ছবি।
কাশ্মীর, সিরিয়া ও ইয়েমেনের পরিস্থিতিও আজ বৈশ্বিক বিবেকের জন্য এক কঠিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিরিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এখনো পুরোপুরি থামেনি; ইয়েমেনে মানবিক বিপর্যয় বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ সংকট হিসেবে রয়ে গেছে; কাশ্মীরে রাজনৈতিক অস্থিরতা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। এসব অঞ্চলে ঈদ মানে উৎসবের চেয়ে অনেক বেশি—এটি টিকে থাকার আরেকটি দিন, আরেকটি পরীক্ষা।
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলসহ বিশ্বের অনেক দরিদ্র অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন, খরা এবং খাদ্যসংকট মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। সেখানে ঈদের আনন্দ অনেক সময় একবেলার খাবার নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবুও তারা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় এবং সামান্য যা আছে তা ভাগ করে নেয়—যা ঈদের প্রকৃত শিক্ষা বহন করে।
অন্যদিকে, ইউরোপ, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন উন্নত শহরে বসবাসরত প্রবাসী মুসলমানদের ঈদ আবার ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। তারা প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য এবং সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে ঈদ উদযাপন করলেও প্রবাস জীবনের একাকীত্ব, পরিচয়ের সংকট এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তাদের আনন্দকে অনেক সময় আংশিকভাবে সীমিত করে দেয়।
এই বৈপরীত্যপূর্ণ বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—ঈদ কি শুধুই ব্যক্তিগত আনন্দের উৎসব, নাকি এটি একটি বৈশ্বিক মানবিক দায়িত্ব? ইসলামি শিক্ষার আলোকে ঈদ আমাদের শেখায় ভাগাভাগি, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোর কথা। যাকাত, সদকা এবং সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে আমরা যদি কষ্টে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়াতে না পারি, তবে ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পায় না।
আজকের বিশ্বে, যেখানে বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে, সেখানে ঈদের শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। একটি ছোট সহায়তা, একটি মানবিক উদ্যোগ কিংবা একটি আন্তরিক দোয়া—এসবই কারও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
নির্যাতিত মুসলিম উম্মাহর এই ঈদের চিত্র আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা সবাই এক দেহের অঙ্গের মতো; কোথাও ব্যথা লাগলে তার প্রতিধ্বনি অন্যত্রও অনুভূত হওয়া উচিত।
আসুন, আমরা ঈদের আনন্দকে সীমাবদ্ধ না রেখে তা বৈশ্বিক মানবিকতার পরিসরে বিস্তৃত করি। শুধু নিজের পরিবার নয়, বরং সমগ্র উম্মাহর জন্য ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিই। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি—তিনি যেন পৃথিবীর সব নিপীড়িত মানুষের কষ্ট লাঘব করেন এবং আমাদেরকে ন্যায় ও মানবতার পথে অবিচল রাখেন।
লেখক: ব্যাংকার