ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
দেশজুড়ে গভীরতর হতে থাকা জ্বালানি সংকটের মাঝে পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে অপেক্ষার সারি। অনেক পাম্পে ঝোলানো হয়েছে ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড। কিন্তু পরিস্থিতি কি আসলেই এতটা ভয়াবহ?
শুধু যশোর নয় দেশের বিভিন্ন জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দোকান, ব্যক্তিগত বাড়ি, ধানের গুদাম, ভূগর্ভস্থ ট্যাংক এমনকি গোয়ালঘরেও লুকিয়ে রাখা জ্বালানি তেলের সন্ধান পাচ্ছে। শান্তি হিসেবে দেয়া হচ্ছে জেল জরিমানা । ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালাচ্ছে, জরিমানা ও স্বল্পমেয়াদী কারাদণ্ড দিচ্ছে। প্রধান পাম্পগুলোতে বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে—যা কেবল অভ্যন্তরীণ মজুদদারি নয়, বরং পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে (যেখানে তেলের দাম তুলনামূলক বেশি) পাচার রোধেও সরকারের উদ্বেগের প্রতিফলন। তবে যেভাবে একের পর এক তেলের মজুদ উদ্ধার হচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে বর্তমান নজরদারি এই অসাধু প্রবণতা দমনে এখনো পুরোপুরি যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশে পণ্য মজুদ করার এই প্রবণতা নতুন কিছু নয়। জ্বালানি, এলপিজি, লবণ বা চিনি—যেকোনো কিছুর সামান্য সংকটের গুঞ্জন উঠলেই সাধারণ মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনতে ভিড় জমায়। যা শুরু হয় সতর্কতা হিসেবে, তা দ্রুতই ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত কেনাকাটায় রূপ নেয়। দীর্ঘ লাইন আর খালি তাক দেখে মানুষের মনে ভয় দানা বাঁধে যে, পরে হয়তো আর কিছুই পাওয়া যাবে না। এভাবে মজুদদারি কেবল অসাধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা সাধারণ গৃহস্থালি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং সংকটকে আরও ঘনীভূত করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা বলেন, যেসব সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার অভাব রয়েছে, সেখানে মানুষ আত্মরক্ষার কৌশলের ওপর বেশি নির্ভর করে। মজুদদারি মানে শুধু মুনাফা নয়, এটি বর্জিত হওয়ার ভয় থেকেও জন্মায়। এর মূলে রয়েছে দুর্বল তদারকি ও সুশাসন। যখন মানুষ মনে করে সংকটের সময় রাষ্ট্র তাকে প্রয়োজনীয় পণ্য নিশ্চিত করতে পারবে না, তখনই তারা প্যানিক বায়িং-এ লিপ্ত হয়। তিনি আরও জানান, এটি একটি সর্বজনীন প্রবণতা। কোভিড-১৯ এর সময় যুক্তরাষ্ট্রেও টয়লেট পেপার নিয়ে এমন কাণ্ড দেখা গিয়েছিল। চাল বা জ্বালানির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
তার এই পর্যবেক্ষণ সংকটের ভিন্ন একটি দিক উন্মোচন করে: মজুদদারি কেবল শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়, এটি সরবরাহ চেইন ও সুশাসনের প্রতি আস্থাহীনতার একটি পূর্বাভাস।
ড. সামিনা যখন আচরণগত কারণগুলো চিহ্নিত করছেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন তখন সংকটের কাঠামোগত কারণগুলো তুলে ধরছেন। তিনি বলেন, "চাহিদা ও জোগানের মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে একা মুনাফা করা সম্ভব নয়; মানুষকে সরকারের সাথে সহযোগিতা করতে হবে। একই সাথে সরকারকে সুনির্দিষ্ট নীতি ও লক্ষ্য নিয়ে মানুষকে আশ্বস্ত করতে হবে।"
সরকার এখনো আশ্বাস দিচ্ছে যে জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। গত ২৭ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, "বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা সত্ত্বেও আমরা তেলের দাম বাড়াইনি। আমরা জানি তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। বিভিন্ন মহলের চাপ থাকা সত্ত্বেও জনদুর্ভোগ এড়াতে সরকার প্রতিদিন ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে।
এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে সরকার।
৩১ মার্চ মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। এতে বলা হয়, ভোক্তা পর্যায়ে এপ্রিলে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা করা হয়েছে। কেরোসিনের দাম প্রতি লিটার ১১২ টাকা, পেট্রলের দাম প্রতি লিটার ১১৬ আর অকটেনের দাম ১২০ টাকা করা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারি ও মার্চে এ দামেই বিক্রি হয়েছিল জ্বালানি তেল।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এপ্রিল মাসের জন্য ৯ কার্গো এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ, যার জন্য অতিরিক্ত ৪,৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তবে ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। তিনি মনে করেন, জনপ্রিয়তার কথা ভেবে দাম সমন্বয়ের পথটি একদম বন্ধ করে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি, কারণ এতে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। আইএমএফ-এর শর্ত অনুযায়ী যে অটোমেটিক প্রাইসিং বা স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু হয়েছিল, সেটি অনুসরণ করলে পরিস্থিতি হয়তো এতটা জটিল হতো না। পাশাপাশি কন্টেইনারে করে তেল মজুদ বন্ধে কঠোর তদারকি প্রয়োজন।
ড. সামিনা লুৎফা বর্তমান তদারকি ব্যবস্থাকে অপর্যাপ্ত মনে করেন। তিনি বলেন, "২৮ টন তেল মজুদের দায়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা কোনো পাম্প মালিকের জন্য যথেষ্ট শাস্তি নয়। শাস্তির মাত্রা এমন হতে হবে যাতে অপরাধ করার ঝুঁকি নিতে কেউ সাহস না পায়।"
বর্তমান জ্বালানি সংকট কেবল সরকারের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক যুদ্ধের ফলাফল যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে রাষ্ট্র এখন কীভাবে এটি মোকাবিলা করছে, সেটাই আসল। কার্যকর নজরদারি, সুসংগত নীতি এবং স্বচ্ছ সুশাসনই পারে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে। যদি আইনের প্রয়োগ দৃশ্যমান হয় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিষ্কার থাকে, তবে জ্বালানি পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল করা সম্ভব। এ ধরনের সংকট সরকারের সহনশীলতার পরীক্ষা নেয়, তবে এটি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার একটি সুযোগও বটে।
সূত্র : টিবিএস