বাগেরহাট প্রতিনিধি
স্মৃতি বিয়ের স্মৃৃতি জীবনের ছবি: সংগৃহীত
বউ সেজে বাবার বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় প্রতিটি মেয়ের চোখেই অশ্রু থাকে। কিন্তু সেই অশ্রু হয় নতুন সংসারে পা রাখার রোমাঞ্চ আর পুরনো শিকড় ছিঁড়ে যাওয়ার মিশ্র অনুভূতি। খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের মিতু আক্তারের ক্ষেত্রেও তেমনটাই হওয়ার কথা ছিল। লাল বেনারসি, হাতে মেহেদি সবই ছিল ঠিকঠাক। বর সাব্বিরের সাথে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করতে গাড়িতে চেপেছিলেন তিনি। কিন্তু কে জানতো, বিয়ের সেই রঙিন সাজই হবে তার শেষ সাজ, আর হাস্যোজ্জ্বল সেই প্রথম ছবিটাই হবে জীবনের শেষ স্মৃতি! শুরুর আগেই ফুরিয়ে যাবে পথ।
স্বজনরা বিলাপ করে বলছেন, বিয়ের আসরে তোলা হাস্যোজ্জ্বল সেই ছবিগুলোই যে তাদের শেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে, তা কেউ ভাবেনি। বিয়ের আসরের সেই ‘প্রথম ছবি’ এখন শোকাতুর পরিবারের কাছে এক বুকফাটা যন্ত্রণার নাম। মিতুর খালা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, বোনের তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে দুইজনই চলে গেল, ছোট ইসমাইলটা শুধু রয়ে গেল গাড়িতে জায়গা ছিল না বলে।
বিয়ের আনন্দ আর উৎসবের বাতি নিভে গিয়ে এখন কয়রা আর মোংলা জুড়ে কেবলই শোকের মাতম। যে বাড়িতে নতুন বউ আসার কথা ছিল খুশির আমেজ নিয়ে, সেখানে এখন কেবলই কবরের নিস্তব্ধতা।
বাগেরহাটের রামপালে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে কনেসহ তিনজনের বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নে। বিয়ের উৎসবের বাড়িতে একদিন বাদেই শোকের মাতম। আপনজনদের হারিয়ে একদিনে স্বজনদের আহাজারিতে যেমন পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে তেমনি পুরো এলাকায় শোকের ছায়া।
সরেজমিনে দেখা যায়, একদিন আগেও যে বাড়িতে ছিল হাসি-আনন্দ আর উৎসবের আমেজ, মাত্র এক রাতের ব্যবধানে সেই বাড়িতেই এখন বুকফাটা কান্না। বিয়ের সাজে নতুন জীবন শুরু করার কথা ছিল মিতু ও সাব্বিরের। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস—বিদায়ের গাড়িতেই শেষ হয়ে গেল তাদের পথচলা। একদিনের ব্যবধানে আনন্দের বাড়ি পরিণত হলো শোকের বাড়িতে।
স্থানীয়রা জানান, বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন কয়রার মেয়ে মিতু আক্তার ও মোংলার যুবক সাব্বির। সারাদিনের আয়োজন শেষে রাতভর ছিল বিয়ের আনন্দ, আত্মীয়-স্বজনের ভিড় আর নতুন জীবনের স্বপ্ন। রাতটা কনের বাড়িতেই কাটান বরপক্ষের সবাই। সকালে ছিল বিদায়ের মুহূর্ত। হাসি, কান্না আর নতুন জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে নববধূকে নিয়ে বরের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় মাইক্রোবাসটি।
একই গাড়িতে ছিলেন নববধূ মিতু আক্তার, তার বোন লামিয়া, দাদি রাশিদা। পরিবারের সবার মুখে তখনও ছিল বিয়ের আনন্দের রেশ। কিন্তু কেউ জানতো না, সেই যাত্রাই হবে জীবনের শেষ পথচলা। বাগেরহাটের রামপালে পৌঁছাতেই ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। নৌবাহিনীর বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় বিয়ের যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটির। মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় গাড়ি—একে একে নিভে যায় ১৪টি তাজা প্রাণ।
নিহত নববধু মিতু আক্তার স্থানীয় একটি মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। মিতুর ছোট বোন লামিয়া একই মাদ্রাসার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
নিহত বর আহাদুর রহমান ছাব্বির মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে। আবদুর রাজ্জাকের পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে। এ দুর্ঘটনায় তার দুই ছেলে, মেয়ে, এক পুত্রবধূ ও চার নাতি মারা গেছে।
নিহত আবদুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সরদার বলেন, আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তার মেয়েরও বিয়ে দিয়েছেন কয়রায়। এই ছেলেরও সেখানে বিয়ে দিয়েছিলেন। দুর্ঘটনায় পুরো পরিবারটা শেষ হয়ে গেল।