ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ৪০ দিনের ছুটি শেষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি ক্লাস শুরু হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে আংশিক অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন কতটা যৌক্তিক হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ খরচ কমাতে সাপ্তাহিক ক্লাসের একটি অংশ অনলাইনে নেওয়ার প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। বিশেষ করে গরমকাল ও জ্বালানি সংকটের সময় বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এটিকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
শিক্ষকদের একটি অংশ মনে করছেন, সংকটকালীন পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাস একটি তাৎক্ষণিক সমাধান হতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় অর্জিত অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
এ প্রসঙ্গে তেজগাঁও হাই স্কুলের শিক্ষিকা মাজেদা মুজিব বলেন, "আমরা এর আগেও অনলাইন ক্লাস নিয়েছি। জনগণের সুবিধার জন্য যদি এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সরকার তা নিতে পারে। তবে শিক্ষার্থীদের কিছুটা ক্ষতি তো হবেই, তাই অনলাইন ক্লাসগুলো আরও জোরদার করতে হবে।"
মাঠপর্যায়ের শিক্ষকরা বলছেন, অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ও মনোযোগ ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় এটি আরও কঠিন। কুড়িগ্রামের তিলাই জয়চন্ডি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নাজমুন নাহার বলেন, "গ্রামের বাচ্চারা অনলাইনে অভ্যস্ত নয়, তাদের কাছে ডিভাইসও নেই। এ সিদ্ধান্ত তাদের জন্য কতটা কার্যকর হবে, তা ভাবার বিষয়।"
অভিভাবকদের মধ্যেও এ বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেকেই সংকটকালীন সমাধান হিসেবে অনলাইন ক্লাসকে সমর্থন করলেও বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরছেন।
লিটল উইলস ফ্লাওয়ার স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আবুল কাশেম বলেন, "আমার দুই সন্তান—একজন ষষ্ঠ শ্রেণিতে, আরেকজন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। অনলাইন ক্লাসের জন্য তাদের মোবাইল ফোন কোথায় পাব? আমাদের কাজ ফেলে কি সারাক্ষণ তাদের পাশে বসে থাকবো?"
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সাজিয়া আক্তার বলেন, "আমার বাচ্চা ছোট, আমি কর্মজীবী। ও এখনো একা ডিভাইস ব্যবহার করে ক্লাস করার মতো বড় হয়নি। আগেও অনলাইন ক্লাস আমাদের জন্য সুবিধাজনক ছিল না।"
শিক্ষাবিদদের একটি অংশও এই উদ্যোগের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, দেশের সব অঞ্চলে এখনো সমান প্রযুক্তিগত সুবিধা পৌঁছায়নি।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, "বর্তমান সরকারের শিক্ষাখাত নিয়ে উদ্যোগ ইতিবাচক। এখন এক বৈশ্বিক সংকট আমাদের ওপর প্রভাব ফেলছে। করোনার সময় আমরা অনলাইন শিক্ষার সীমাবদ্ধতা দেখেছি। সরকারকে এবার বিকল্প ভাবতে হবে। যাদের কাছে ডিভাইস নেই, বিশেষ করে শ্রমজীবী পরিবারের শিশুদের কথা বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজনে স্কুল খোলা রেখে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা যেতে পারে।"
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, এখনো এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রস্তাবটি মূলত জ্বালানি সাশ্রয়ের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে এবং সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে চালুর সম্ভাবনাও রয়েছে।
সার্বিকভাবে, জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে অনলাইন ক্লাস একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে উঠে এলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নীতিনির্ধারণের বাস্তবতার ওপর—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সূত্র : টিবিএস