ধ্রুব ডেস্ক
দেশে নকলমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আলোচিত নাম ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। দুই দশক আগে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে পাবলিক পরীক্ষায় নকলবিরোধী কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত এই বিএনপি নেতা এবার নতুন সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায়, আগামী ২১ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ঘিরে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ—নকল ও প্রশ্ন ফাঁসমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। অতীত অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় তিনি কতটা সফলতা দেখাতে পারেন, সেদিকেই এখন সবার নজর।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন পরীক্ষায় ছড়িয়ে পড়া নকল ও প্রশ্ন ফাঁসের মতো ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করা নতুন শিক্ষামন্ত্রীর জন্য বেশ চ্যালেঞ্জের হবে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যাপক পদক্ষেপ নিচ্ছেন তিনি। এরই মধ্যে শিক্ষাপ্রশাসন, সব শিক্ষাবোর্ডসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে পরীক্ষায় নকল ও অনিয়ম চিরতরে নির্মূল করতে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণাসহ নানা নির্দেশনা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরীক্ষার আগেই বোর্ড কর্তৃপক্ষের কেন্দ্র পরিদর্শন ও প্রতিবেদন জমা, সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ নানা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পরীক্ষার সময় কেন্দ্র পরিদর্শনেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও আগের মতো হেলিকপ্টার নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে পরিদর্শনে ছুটবেন বলে জানা গেছে। এসএসসির পাশাপাশি আগামী এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নিয়েও নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করছে শিক্ষাপ্রশাসন।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন ড. এহছানুল হক মিলন। সে সময় নকলের বিস্তৃতি রোধে দেশের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ করেই হেলিকপ্টারে করে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে উপস্থিত হতেন। তার এ পদক্ষেপে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে নকল। প্রায় ২০ বছর পর তিনি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি এবার আগের চেয়েও জোরদারভাবে নকলবিরোধী কার্যক্রম চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
গত ২৫ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আসন্ন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নকল ও প্রশ্ন ফাঁসমুক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। এ সময় তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে নকলমুক্ত পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। অতীতে শিক্ষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে যেভাবে নকল প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল, আগামীতেও আমরা সেই ধারা বজায় রাখব। বিভাগীয় শহরগুলোতে কেন্দ্র সচিব ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু পরীক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
সভায় আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোর বাস্তব পরিস্থিতি ও সমস্যা চিহ্নিত করতে সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিজে অথবা প্রতিনিধির মাধ্যমে কেন্দ্র পরিদর্শন করে মন্ত্রণালয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। সর্বোপরি পরীক্ষায় নকল ও অনিয়ম চিরতরে নির্মূল করতে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয় সভা থেকে।
মাউশির ১১ দফা নির্দেশনা
আসন্ন এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ সুষ্ঠু, সুন্দর ও নকলমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কেন্দ্রসচিবসহ মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের প্রতি ১১ দফা বিশেষ নির্দেশনা জারি করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। গত ২৫ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তের আলোকে এই নির্দেশনার কথা জানিয়ে ২৮ মার্চ মাউশির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক বিএম আব্দুল হান্নান স্বাক্ষরিত চিঠি সব শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্র সচিব ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, আগামী ২১ এপ্রিল থেকে সারা দেশে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই পরীক্ষায় যে কোনো ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ওই পরীক্ষা সুষ্ঠু, সুন্দর ও নকলমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সব কেন্দ্রসচিবসহ মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনাগুলো আবশ্যিকভাবে প্রতিপালন করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
১১ দফা নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে— এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে নির্বাচিত প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রসহ কেন্দ্রের প্রতিটি কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে; যেসব পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা অচল/অকেজো অবস্থায় রয়েছে, সেসব কেন্দ্রের সিসিটিভি ক্যামেরা পরীক্ষা শুরুর আগেই সচল করার ব্যবস্থা করতে হবে; সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণকৃত সব ভিডিও যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাহিদা মোতাবেক তা সরবরাহ করতে হবে।
সব পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রতিটি কক্ষে ঘড়ি (কাঁটাওয়ালা) লাগানোর ব্যবস্থা নিতে হবে; স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শক্রমে পরীক্ষা কেন্দ্রের নিরাপত্তা রক্ষার্থে নিরাপত্তা বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা করতে হবে; কেন্দ্রসচিব ব্যতীত পরীক্ষার হলে কোনো শিক্ষক/পরীক্ষার্থী যাতে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে; পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী কোনো পরীক্ষার্থী যাতে কোনো উপায়েই নকল বা অসদুপায় অবলম্বন করতে না পারে সে বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। পরীক্ষার্থীদের দেহ তল্লাশি করে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। মেয়ে পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে নারী শিক্ষক দ্বারা দেহ তল্লাশির ব্যবস্থা করতে হবে।
এছাড়াও নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে পরীক্ষা সুষ্ঠু, সুন্দর ও নকলমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রধান ফটকে অভিভাবকসহ শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা টানিয়ে দিতে হবে; প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নসহ পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক কেন্দ্রসচিবদের প্রতি দেওয়া নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে প্রতিপালন করতে হবে; সর্বোপরি পরীক্ষা সুষ্ঠু, সুন্দর ও নকলমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালন করতে হবে। এগুলো প্রতিপালনে কোনো ধরনের অবহেলা/গাফিলতির কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রসচিবসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষার আগেই কেন্দ্র পরিদর্শন ও প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য টিম গঠন করেছে শিক্ষাবোর্ডগুলো। গত শনিবার ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসএসসি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শনে ঢাকা মহানগরীর জন্য আটটি এবং ঢাকাসহ অন্যান্য জেলার জন্য আরো আটটি টিম গঠন করা হয়েছে।
এসব টিম কেন্দ্র পরিদর্শনকালে স্থানীয় প্রশাসন, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কেন্দ্রসচিব ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করবে। প্রতিটি সভার কমপক্ষে পাঁচ মিনিটের একটি ভিডিও ধারণ করে সংরক্ষণ করতে হবে। এসব টিম পরিদর্শন করা প্রতিটি কেন্দ্র সম্পর্কে আলাদা আলাদা সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দেবেন। ২৯ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিলের মধ্যে এ পরিদর্শন শেষ করতে হবে। প্রতিটি জেলা থেকে কমপক্ষে ১০টি পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শন করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ধ্রুব/এস.আই