Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

দেশে দেশে লাইলাতুল কদর: মহিমা ও বৈচিত্র্য

ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ
প্রকাশ : সোমবার, ১৬ মার্চ,২০২৬, ১১:৫২ পিএম
দেশে দেশে লাইলাতুল কদর: মহিমা ও বৈচিত্র্য

লাইলাতুল কদর বা কদরের রাত মুসলিম উম্মাহর জন্য আধ্যাত্মিক বসন্তের মতো। এটি এমন এক রাত, যার মাহাত্ম্য বোঝাতে গিয়ে মহান আল্লাহ একে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা করেছেন। পবিত্র রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে নিহিত এই মহিমান্বিত রজনী কেবল ইবাদতের জন্য নয়, বরং বিশ্ব মুসলিমের ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য প্রকাশেরও এক অনন্য মাধ্যম। আরবের মরুময় প্রান্তর থেকে শুরু করে এশিয়ার সবুজ জনপদ কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার আধুনিক শহরগুলোতে এই রাতটি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় পালিত হয়। আরবি পত্র-পত্রিকা এবং বিশিষ্ট আলেমদের বর্ণনায় এই রাতের গুরুত্ব ও উদযাপনের যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা অত্যন্ত গভীর এবং অনুপ্রেরণাদায়ক।

মাজহাবগত দৃষ্টিভঙ্গি ও সময় নির্ধারণ

লাইলাতুল কদর ঠিক কোন রাতে হবে, তা নিয়ে ইসলামের বিভিন্ন মাজহাব ও পণ্ডিতদের মধ্যে সুচিন্তিত বিশ্লেষণ রয়েছে। যদিও সুনির্দিষ্ট একটি রাতকে কুরআন বা সুন্নাহ নিশ্চিত করে দেয়নি, তবে অধিকাংশ ফকিহ শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোর ওপর জোর দিয়েছেন। সৌদি আরবের প্রভাবশালী পত্রিকা 'আশ-শারক আল-আওসাত'-এর এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, "লাইলাতুল কদরকে গোপন রাখার পেছনে মূল রহস্য হলো, বান্দা যেন কেবল একটি রাতে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো শেষ দশ দিন আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকে।"

হানাফি মাজহাবের মতে, লাইলাতুল কদর রমজানের যেকোনো রাতে হতে পারে, তবে সাতাশতম রজনী হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে অনেক আলেম বলেন, সারা বছর ইবাদতে মশগুল থাকাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য, যাতে কদরের রাতটি কোনোভাবেই মিস না হয়। অন্যদিকে, শাফেয়ী মাজহাবের মতে ২১ বা ২৩তম রাত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। মালিকী ও হাম্বলী মাজহাবের অনুসারীরাও শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে এটি তালাশ করার প্রতি গুরুত্ব দেন। শিয়া মাজহাবের অনুসারীরা প্রধানত ১৯, ২১ এবং ২৩তম রাতকে গুরুত্ব প্রদান করেন, বিশেষ করে ২১তম রাতটি তাদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মাজহাবগত এই বৈচিত্র্য আসলে উম্মাহর জন্য ইবাদতের পরিধিকেই প্রশস্ত করেছে।

সৌদি আরব ও মক্কা-মদিনার দৃশ্যপট

পবিত্র ভূমি সৌদি আরবে লাইলাতুল কদর কেন্দ্রিক আমেজ রমজানের শুরু থেকেই পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে সাতাশতম রাতে মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববীতে লাখো মানুষের ঢল নামে। আরবি দৈনিক 'আল-রিয়াদ' তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে লিখেছে, "হারামাইন শরিফাইনে সাতাশতম রাতের কিয়ামুল লাইল বা দীর্ঘ সালাতে অংশগ্রহণ করতে আসা মুসল্লিদের ভিড় যেন শুভ্র সাগরের ঢেউয়ের মতো দেখায়। এটি কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং মহান রবের দরবারে আত্মসমর্পণকারী বিশ্ব উম্মাহর এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি।" সৌদি আরবে এই রাতে ইতিকাফকারীদের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে এবং মসজিদের প্রবেশপথে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে খেজুর, পানি এবং কফি বিতরণের এক অসাধারণ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। আরবে বিশ্বাস করা হয় যে, এই রাতে দান-সদকা করা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি সওয়াব বয়ে আনে।

উত্তর আফ্রিকা ও মাগরেব দেশসমূহের ঐতিহ্য

মরক্কো, আলজেরিয়া এবং তিউনিসিয়ার মতো উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে লাইলাতুল কদর উদযাপনের ধরণ অত্যন্ত রাজকীয় এবং আধ্যাত্মিক। মরক্কোর বিখ্যাত পত্রিকা 'হেসপ্রেস' (Hespress) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, "মরক্কোর সমাজ ব্যবস্থায় লাইলাতুল কদর হলো পবিত্রতা ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার রাত। বিশেষ করে শিশুদের প্রথম রোজা পালনের জন্য এই রাতটিকে তারা বেছে নেয়।" মরক্কোতে এদিন শিশুদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সাজিয়ে ঘোড়ায় চড়িয়ে ঘোরানো হয় এবং বড়রা তাদের উপহার দেন। তিউনিসিয়ায় এই রাতে পাড়ায় পাড়ায় বিশাল ভোজের আয়োজন করা হয়। 'কুসকুস' নামক তাদের জাতীয় খাবারটি এই রাতে সবার ঘরে ঘরে তৈরি হয় এবং দরিদ্রদের মাঝে অকাতরে বিতরণ করা হয়। আলজেরিয়ায় এই বরকতময় রাতে শিশুদের খৎনা করানোর একটি প্রাচীন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা রয়েছে, যা তারা সওয়াবের কাজ বলে মনে করেন।

মিশর ও নীল নদের তীরের আধ্যাত্মিকতা

মিশরে লাইলাতুল কদর বা সাতাশতম রাতটি 'কুরআনের রাত' হিসেবে পরিচিত। মিশরের ঐতিহাসিক আল-আজহার মসজিদে এদিন বিশেষ মাহফিল ও কুরআন তিলাওয়াতের আয়োজন করা হয়। মিশরের 'আল-আহরাম' পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, "কায়রোর অলিগলিতে কদরের রাতে যখন কুরআন তিলাওয়াতের সুর ভেসে আসে, তখন মনে হয় প্রতিটি ধূলিকণা আল্লাহর জিকিরে মত্ত। নীল নদের তীরে ইবাদতের এই দৃশ্য শতাব্দী প্রাচীন এক আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার।" মিশরের ধর্ম মন্ত্রণালয় এদিন আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত বিজয়ীদের সম্মাননা প্রদান করে, যাতে রাষ্ট্রপ্রধান স্বয়ং উপস্থিত থাকেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই রাতে 'ফানুস' বা বিশেষ প্রদীপ জ্বালানোর ঐতিহ্যও কিছুটা দেখা যায়।

দক্ষিণ এশিয়া: বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে লাইলাতুল কদর বা 'শবে কদর' অত্যন্ত গভীর ভক্তি ও আবেগের সাথে পালিত হয়। এ দেশগুলোতে সাতাশতম রমজানকে কেন্দ্র করে সরকারি ছুটি থাকে। প্রতিটি গ্রাম ও শহরের মসজিদগুলোতে আলোকসজ্জা করা হয় এবং সারারাত জেগে ইবাদত করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের কাছে হালুয়া-রুটি বা বিশেষ মিষ্টান্ন তৈরি করে প্রতিবেশী ও গরিবদের খাওয়ানো একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক রেওয়াজ। এ অঞ্চলের মসজিদগুলোতে খতমে তারাবির মাধ্যমে পবিত্র কুরআন সম্পন্ন করা হয় এই রাতে। ভারতের দিল্লি বা হায়দ্রাবাদের মসজিদগুলোতে এই রাতে মুসল্লিদের তিল ধারণের জায়গা থাকে না। মানুষ বিশ্বাস করে, এই রাতে আল্লাহর রহমতের দরজা উন্মুক্ত থাকে এবং দোয়া সরাসরি কবুল হয়। কবরস্থানে গিয়ে মৃত স্বজনদের জন্য দোয়া করাও এই অঞ্চলের একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ।

তুরস্ক ও ইউরোপের মুসলিম সমাজ

তুরস্কের ওসমানীয় আমলের ঐতিহ্যগুলো এখনো কদরের রাতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ইস্তাম্বুলের ব্লু মস্ক বা সুলতান আহমেদ মসজিদে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন। তুর্কি সংবাদমাধ্যম 'ডেইলি সাবাহ' এর মতে, "তুরস্কে কদরের রাতে 'কাদিল' (Kandil) প্রদীপ জ্বালিয়ে শহরগুলোকে আলোকিত করা হয়। এটি এমন এক আধ্যাত্মিক মিলনমেলা যা প্রাচীন অটোমান ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক তুরস্কের সেতুবন্ধন তৈরি করে।" জার্মান বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে বসবাসরত মুসলিম অভিবাসীরা এই রাতে ইসলামিক সেন্টারগুলোতে একত্রিত হন। সেখানে কেবল ইবাদত নয়, বরং বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের মধ্যে ভাববিনিময় ও সামষ্টিক নৈশভোজের মাধ্যমে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হয়।

মধ্য এশিয়া ও শান-শওকত

উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও কাজাখস্তানের মতো দেশগুলোতে লাইলাতুল কদর উপলক্ষে ঐতিহাসিক সমরকন্দ ও বুখারার মসজিদগুলো জেগে ওঠে। এসব অঞ্চলে সুফিবাদের প্রভাব থাকায় জিকির ও মারফতি গানের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি করা হয়। আরবি সাময়িকী 'আল-মাজাল্লাহ' তাদের এক প্রতিবেদনে মধ্য এশিয়ার এই রাত নিয়ে লিখেছে, "সিল্ক রোডের এই দেশগুলোতে লাইলাতুল কদর কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি তাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষ তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিচারণ করে এবং তিলাওয়াতের মাধ্যমে রাতটিকে জীবন্ত রাখে।"

ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রূপরেখা

বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় লাইলাতুল কদরকে 'মালাম সালিকুর' (Malam Selikur) বা একুশতম রাত থেকে শুরু হওয়া উৎসব হিসেবে দেখা হয়। মালয়েশিয়ার পত্রিকা 'দ্য স্টার' তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, "মালয়েশিয়ানরা কদরের রাতে বাড়িঘর ও মসজিদগুলো মোমবাতি বা তেল প্রদীপ (Lampan Pelita) দিয়ে সাজাতে পছন্দ করে। এই আলো কেবল বাহ্যিক নয়, বরং হৃদয়ের অন্ধকার দূর করার প্রতীক।" মালয়েশিয়ায় এই রাতে বিশেষ করে 'বুবুর ল্যাম্বুক' বা এক প্রকার চালের জাউ রান্না করে মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়।

আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার মেলবন্ধন

লাইলাতুল কদর কেবল আনুষ্ঠানিকতার রাত নয়, বরং এটি মানবতার সেবায় নিবেদিত হওয়ারও সময়। কুয়েতের প্রভাবশালী পত্রিকা 'আল-কাবাস' এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছে, "লাইলাতুল কদরের প্রকৃত সার্থকতা কেবল লম্বা সিজদায় নয়, বরং ক্ষুধার্তের মুখে অন্ন জোগানো এবং আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে। কারণ হাজার মাসের চেয়ে উত্তম হওয়ার মানে হলো কর্মফলের এক বিশাল মহিমা।" এই রাতে সারা বিশ্বের মুসলিমরা ফিলিস্তিন, সিরিয়া বা মিয়ানমারের নিপীড়িত মুসলিমদের জন্য বিশেষ দোয়া করেন। রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক বিভেদ ভুলে সবাই একই কাতারে দাঁড়িয়ে মহান রবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

শেষকথা

পরিশেষে বলা যায়, লাইলাতুল কদর হলো মুমিনের জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। এটি এমন এক সময় যখন আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে এক অলৌকিক সংযোগ স্থাপিত হয়। ভৌগোলিক দূরত্ব বা সাংস্কৃতিক ভিন্নতা থাকলেও লাইলাতুল কদরের মূল চেতনা—অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও আত্মশুদ্ধি—সারা বিশ্বে অভিন্ন। আরবি পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আমলনামা, সর্বত্রই এই রাতের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ফুটে ওঠে। বিভিন্ন মাজহাবের ভিন্নতা আমাদের জন্য রহমত স্বরূপ, যা আমাদের ইবাদতের বিভিন্ন পথ বাতলে দেয়। এই রাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষ হিসেবে আমাদের সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো স্রষ্টার ইবাদত ও সৃষ্টির সেবা। তাই দেশভেদে রীতিনীতি যাই হোক না কেন, লাইলাতুল কদরের পবিত্র আলো যেন প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করে, এটাই এই মহিমান্বিত রজনীর প্রকৃত সার্থকতা।

সূত্র: লেখাটি বিভিন্ন অন্তর্জাল ঘেটে প্রস্তুত করা।

 

লেখক: ধ্রুবনিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক ও গবেষক

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)