মুফতি সাইফুল ইসলাম
ছবি: প্রতীকী
রমজান মাসের শেষ দশক মুসলিম জীবনের এক গভীর আধ্যাত্মিক সময়। দিনভর সিয়াম সাধনার পর এই সময়ের রাতগুলো হয়ে ওঠে আরও বেশি ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ। আজ ২০ রমজানের দিন শেষ হলেই শুরু হবে ২১ রমজানের রাত, আর এ রাত থেকেই শুরু হয় সেই মহামূল্যবান রাতের অনুসন্ধান, যাকে কোরআন বলছে মর্যাদার রাত, ভাগ্য নির্ধারণের রাত, রহমত ও ক্ষমার রাত। তাই আজকের রাতটি সেই গুরুত্বপূর্ণ রাতের অন্তভূক্ত হতে পারে।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এ রাতের মহিমা ঘোষণা করে বলেন—
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ
“নিশ্চয়ই আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে।
তুমি কি জানো কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।” (সুরা আল-কদর, আয়াত : ১–৩)
এই আয়াতগুলোতে লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব এত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, একজন মুমিনের হৃদয় স্বাভাবিকভাবেই এই রাতকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। অর্থাৎ প্রায় তিরাশি বছরের বেশি সময়ের ইবাদতের সমান সওয়াব একজন বান্দা একটি রাতেই অর্জন করতে পারে।
পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে—
تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ سَلَامٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطْلَعِ الْفَجْرِ
“সে রাতে ফেরেশতারা এবং রূহ (জিবরাইল) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিতে নেমে আসে প্রত্যেক বিষয়ের নির্দেশ নিয়ে। ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত সে রাত শান্তি ও কল্যাণময়।” (সুরা আল-কদর, আয়াত : ৪–৫)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, কদরের রাত শুধু ইবাদতের সওয়াবের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি এমন এক রাত যখন আসমান থেকে অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং পুরো রাত জুড়ে থাকে রহমত, শান্তি ও বরকতের পরিবেশ।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতের গুরুত্ব সম্পর্কে উম্মতকে বিশেষভাবে সচেতন করে বলেছেন— “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদতে দাঁড়াবে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।
” (বুখারি, হাদিস: ২০১৪)
এই হাদিসে লাইলাতুল কদরের সবচেয়ে বড় যে কল্যাণের কথা বলা হয়েছে; তা হচ্ছে গুনাহের ক্ষমা। মানুষের জীবনে ভুল, ত্রুটি ও পাপ অনিবার্য। কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য এমন সুযোগ দিয়েছেন, যাতে একটি রাতের আন্তরিক ইবাদত ও তাওবা বহু গুনাহ মুছে দিতে পারে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কদরের রাত নির্দিষ্ট করে ঘোষণা করা হয়নি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— “তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।
” (বুখারি, হাদিস: ২০১৭)
এই হাদিসের ভিত্তিতে ইসলামী স্কলাররা বলেন, ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমজানের রাতগুলোতে বিশেষভাবে কদরের সন্ধান করা উচিত। এ কারণেই সাহাবায়ে কেরাম শেষ দশকে ইবাদতে অধিক মনোযোগ দিতেন। আয়েশা (রা.) বলেন— “রমজানের শেষ দশক শুরু হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে রাত জেগে ইবাদত করতেন, পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং ইবাদতে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করতেন।” (বুখারি, হাদিস: ২০২৪)
এ থেকেই বোঝা যায়, কদরের রাত লাভের জন্য শুধু একটি রাত নয়, বরং পুরো শেষ দশককে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
কদরের রাতে কী আমল করা উত্তম?
কদরের রাতে কোরআন তিলাওয়াত, নফল সালাত, জিকির, দোয়া, ইস্তিগফার; সব ধরনের ইবাদতই এ রাতে অত্যন্ত মূল্যবান। বিশেষভাবে একটি দোয়ার কথা হাদিসে এসেছে। আয়েশা (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! যদি আমি কদরের রাত পেয়ে যাই, তখন কী দোয়া করব?” তিনি বললেন—
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউন তুহিব্বুল ‘আফওয়া ফা‘ফু ‘আন্নী।
অর্থ “হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন।” (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩)
এই সংক্ষিপ্ত দোয়ার মধ্যে মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ‘ক্ষমা ও মুক্তির আবেদন’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
লাইলাতুল কদর মূলত মানুষের জীবনে এক বিশাল আধ্যাত্মিক সুযোগ। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে এই রাতগুলোতে ইবাদত করে, তার হৃদয় পরিশুদ্ধ হয়, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় হয় এবং তার জীবনের পথ নতুন করে আলোকিত হয়ে ওঠে।
তাই ২০ রমজানের দিন শেষে যখন ২১ রমজানের রাত শুরু হবে, তখন একজন সচেতন মুমিনের হৃদয়ে নতুন আশা জাগ্রত হওয়া উচিত। হয়তো এই রাতই হতে পারে সেই মহামূল্যবান রাত, যেটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। তাই শেষ দশকের প্রতিটি বেজোড় রাতকে গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত, দোয়া ও তাওবায় কাটানোই হবে একজন মুমিনের প্রকৃত প্রজ্ঞা।
কারণ, এই রাতগুলোর কোনো একটিতেই হয়তো আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য রহমত, ক্ষমা ও চিরকল্যাণের দরজা খুলে দেবেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক।
ধ্রুব/এস