এম. জামান
যশোর সদর উপজেলার সতীঘাটা গ্রামের আশরাফুল মাদারিস মসজিদ এখন দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের এক অনন্য আধ্যাত্মিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর সদর উপজেলার সতীঘাটা গ্রামের আশরাফুল মাদারিস মসজিদ এখন দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের এক অনন্য আধ্যাত্মিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আলেম শায়খ ইব্রাহিম ইসমাইল পান্ডু (শায়খ ইব্রাহিম আফ্রিকী)-এর উপস্থিতিতে এখানে ইতিকাফে অংশ নিয়েছেন অন্তত ১৬৮০ জন বা প্রায় ১ হাজার ৬শ মুসল্লি।
শায়খ ইব্রাহিম আফ্রিকী ও বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব
শায়খ ইব্রাহিম আফ্রিকী বিশ্ববরেণ্য আলেম মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহ.)-এর সিলসিলার অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। দক্ষিণ আফ্রিকার এই নাগরিক যেখানেই অবস্থান করেন, তার হাজারো অনুসারী ও আলেম-ওলামা সেখানে সমবেত হন। ২০২৩ সালের পর এ বছর তিনি আবারও যশোরে ইতিকাফ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই নিভৃত পল্লীতে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্ করা যাচ্ছে।
মাদরাসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবার ইতিকাফকারীদের মধ্যে অন্তত ৮০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তারা দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, পানামা ও মিয়ানমার থেকে এসেছেন। এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত অন্তত ১৬০০ মুসল্লি রয়েছেন।
মাসব্যাপী ইবাদত ও অভূতপূর্ব ব্যবস্থাপনা
সাধারণত রমজানের ২০ তারিখ থেকে সুন্নত ইতিকাফ শুরু হলেও, এই মাদরাসায় পহেলা রমজান থেকেই নফল ইতিকাফ শুরু হয়েছে। ফলে অনেক মুসল্লি পুরো মাসজুড়েই এখানে অবস্থান করে ইবাদত-বন্দেগিতে সময় কাটাচ্ছেন। দিন-রাত কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আসকার এবং শায়খ ইব্রাহিম আফ্রিকীর বিশেষ ইসলামী আলোচনার মাধ্যমে এক নূরানী পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
সেবা ও স্বেচ্ছাসেবক: বিশাল এই আয়োজনে মুসল্লিদের সেবায় নিয়োজিত আছেন প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ স্বেচ্ছাসেবক। প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ মানুষের সেহরি ও ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে বড় বড় ডেগে খাবার প্রস্তুত করে প্রতিটি মুসল্লির কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এই মেহমানদারি ঈদের পরের দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
কেন এই ইতিকাফে এত মুসল্লি
বিশাল সংখ্যক মানুষের নির্দিষ্ট কিছু মসজিদে ইতিকাফ করার পেছনে বেশ কিছু আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, যশোরের ক্ষেত্রে শায়খ ইব্রাহিম আফ্রিকীর মতো বিশ্বখ্যাত আধ্যাত্মিক রাহবারের সান্নিধ্য লাভই মুসল্লিদের জন্য প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় আলেমদের সরাসরি বয়ান ও দিকনির্দেশনা পেতে মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে ইতিকাফ করার চেয়ে এমন বড় জামাতে বা ইলমি পরিবেশে ইবাদত করলে একাগ্রতা অনেক বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে শায়খ বা অভিজ্ঞ পীরদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকে নফসের ইসলাহ বা আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ সুযোগ তৈরি হয় এসব বড় ইতিকাফ কেন্দ্রে। এছাড়া থাকা-খাওয়া ও নিরাপত্তার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ইবাদতকারীদের দুশ্চিন্তামুক্ত রাখে, ফলে তারা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ইবাদতে মশগুল থাকতে পারেন।
আশরাফুল মাদারিসের হল সুপার মাওলানা হাসান ইমাম জানান, শায়খ ইব্রাহিম আফ্রিকীর আগমনে এবার অন্তত ১৬৮০ জন মুসল্লি এখানে এসেছেন। তিনি বলেন, "এটি কেবল একটি ইবাদত নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক মিলনমেলা। দেশ-বিদেশের মেহমানদের সেবা করতে পারা আমাদের জন্য বড় সৌভাগ্যের।" ঢাকার মুসল্লি গোলাম মাওলা বাচ্চুর ভাষায়, "২৪ ঘণ্টা ইবাদত ও জিকিরের এমন পরিবেশ সচরাচর পাওয়া যায় না। আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ এখানে তৈরি হয়েছে।" পবিত্র রমজান মাসের এই শেষ দিনগুলোতে যশোরের এই মাদরাসা প্রাঙ্গণ এখন কানায় কানায় পূর্ণ, যেখানে কেবলই ধ্বনিত হচ্ছে আল্লাহর মহিমা।
বাংলাদেশের অনেক জায়গায়র এরকম অনেক বড় বড় ইতিকাফের উদাহরণ রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নানুপুর জামিয়া ওবায়দিয়া মাদরাসা মসজিদের ইতিকাফ দেশের সর্ববৃহৎ ইতিকাফের আসর। এখানে প্রতিবছর দুই থেকে তিনি হাজার মুসল্লি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন। জামিয়া ওবায়দিয়ায় এ ধারা চালু করেছিলেন পটিয়ার মুফতি আজিজুল হক (রহ.)-এর খলিফা সুলতানুল আরেফিন, এরপর মাওলানা সুলতান আহমদ নানুপুরী (রহ.), এরপর মাওলানা জমির উদ্দীন নানুপুরী (রহ.)। তার মৃত্যুর পর এটি পরিচালনা করছেন বর্তমান পীর মাওলানা সালাহ উদ্দীন নানুপুরী।
এতে দেশের প্রায় সব জেলা থেকে নানুপুরী পীর সাহেবের ভক্ত আশেকানসহ অনেক আলেম ওলামা অংশগ্রহণ করে থাকেন।