ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: ফাইল
সম্প্রতি জারিকৃত জ্বালানি তেল কেনার যে সীমা বেঁধেদিয়েছিল সরকার তা তুলে নিতে যাচ্ছে। এর ফলে তেলের রেশনিং প্রথাও উঠে যাবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় শনিবার সন্ধ্যার পর জরুরি বৈঠক করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রোববার সকালে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার কথা রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, মজুত রেখেই সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়াতে ফিলিং স্টেশন ও পরিবহনমালিকেরা চাপ দিচ্ছেন। ঈদযাত্রায় মানুষের ভোগান্তি ঠেকাতে তেল বিক্রির সীমা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমায় দেশেও জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ পরিস্থিতি তৈরি হলে আতঙ্কে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ হারে তেল কেনা শুরু হয়। ফলে এই প্রবণতা ঠেকাতে তেল কেনায় সীমা বেঁধে দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। এ প্রেক্ষিতে ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ কমানো হয়। এর পর থেকে ফিলিং স্টেশনে ব্যাপকভাবে ভিড় করতে থাকেন মানুষ। সরবরাহ বাড়ানোর দাবি তুলতে শুরু করে ফিলিং স্টেশন। সব মিলিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় তেল কেনার সীমা তুলে নিচ্ছে সরকার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সাংবাদিকদের নিশ্চিত করে বলেন, জ্বালানি তেলের সংকট বৈশ্বিক। সব দেশ এর সমাধান খুঁজতে আলোচনা করছে। সরকার বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে কাজ করছে। আগাম সতর্কতা থেকেই রেশনিং করা হয়েছিল। রোববার থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের রেশনিং (সীমা) থাকবে না। বর্তমানে জাপানে আছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী।ইন্দো প্যাসিফিক এনার্জি সিকিউরিটি নিয়ে মন্ত্রী পর্যায়ের দুই দিনের সম্মেলনে (১৪ থেকে ১৫ মার্চ) অংশ নিতে সেখানে রয়েছেন তিনি। সম্মেলনে চলমান জ্বালানিসংকট মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা চলছে। শেষ দিন সম্মেলন থেকে যৌথ ঘোষণা আসার কথাও রয়েছে।
জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক বিক্রি ঠেকাতে ৬ মার্চ থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহে সীমা বেঁধে দেয় সরকার। ১০ মার্চ ‘রাইড শেয়ার’ করা মোটরসাইকেলের জন্য সীমা কিছুটা বাড়ানো হয়। শুরুতে ২ লিটারের সীমা থাকলেও এটি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৫ লিটার করা হয়। এ ছাড়া ফিলিং স্টেশনগুলোতে ৭ মার্চ থেকে চাহিদার চেয়ে ২৫ শতাংশ হারে কম সরবরাহ করা হচ্ছিল। ১১ মার্চ থেকে বিভাগীয় শহরের ফিলিং স্টেশনে ১০ শতাংশ সরবরাহ বাড়ানো হয়। এরপর চাহিদামতো সরবরাহ পেতে সংবাদ সম্মেলন করে দাবি জানান স্টেশনের মালিকেরা। তাছাড়া খুলনায় ডিপো থেকে শনিবার তেল উত্তোলন বন্ধ রাখেন তারা।
প্রসঙ্গত, জ্বালানি তেলের মধ্যে ফিলিং স্টেশন থেকে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রি হয়। এর মধ্যে পেট্রল শতভাগ দেশেই উৎপাদিত হয়। অকটেনের ৫০ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়, বাকিটা আমদানি করা হয়। তাই চিন্তা মূলত ডিজেল নিয়ে। বছরে বিপিসির সরবরাহ করা জ্বালানির প্রায় ৬৫ শতাংশ ডিজেল।দিনে ডিজেলের চাহিদা ১২ হাজার টন।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসে জ্বালানি তেল নিয়ে মোট ১৮টি জাহাজ আসার কথা। ১৪ মার্চ পর্যন্ত ৬টি জাহাজ এসেছে। ২৭ মার্চ পর্যন্ত আরও ৬টি জাহাজ আসার সূচি পাওয়া গেছে। এর বাইরে ৬টি জাহাজের এখন পর্যন্ত সময় সূচি পাওয়া যায়নি। প্রতিটি জাহাজে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন তেল থাকে। এসব জাহাজ মূলত ডিজেল নিয়ে আসছে। শুধু শেষ দুটি জাহাজে ডিজেলের সঙ্গে জেট ফুয়েল থাকবে। আর ১৭ বা ১৮ মার্চে একটি জাহাজে ফার্নেস তেল আসার কথা। এর বাইরে খোলাবাজার থেকে এক জাহাজ পরিমাণ অকটেন কেনার চেষ্টা চলছে।
বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় দুই লাখ টন ডিজেল মজুত আছে। এর বাইরে আরও প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেল আছে, যা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে নতুন জাহাজ যুক্ত হতে থাকবে। অকটেন ও পেট্রলের মজুত আছে এখন ১৬ হাজার টন করে। দেশীয় উৎস থেকে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টন করে পেট্রল ও অকটেন যুক্ত হচ্ছে। দিনে পেট্রল ও অকটেনের চাহিদা ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টন। সীমা তুলে দিয়ে সরবরাহ বাড়ানো হলে মার্চে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট হবে না। তবে কেউ চাহিদার চেয়ে বাড়তি তেল কিনে মজুত করলে চাপ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, জুন পর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি (ডিজেল ও অকটেন) কেনার চুক্তি করা আছে। তবে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহকারীরা তেল পরিশোধন করতে সংকটে পড়বে। সে ক্ষেত্রে আগামী মে মাসে তারা চুক্তি অনুসারে তেল সরবরাহে ব্যর্থ হতে পারে। তাই সরকারি পর্যায়ে জিটুজি (এক দেশের সরকারের সঙ্গে অন্য দেশের সরকারের চুক্তি), উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অথবা সরাসরি প্রক্রিয়ায় তেল কেনার চিন্তা করা হচ্ছে। চুক্তির চেয়ে অতিরিক্ত সরবরাহ চেয়ে ইতিমধ্যে ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বিপিসির একটি সূত্র বলছে, ভারত থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আনতে দেশটির নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের সঙ্গে ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর চুক্তি করে বিপিসি। চুক্তি অনুসারে এ বছর ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল আসার কথা। এর বাইরে আরও অতিরিক্ত ৬০ হাজার টন দেওয়ার কথা, তবে তা নিশ্চিত নয়। এতে মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টন আসার কথা। তবে ভারতকে পাঠানো চিঠিতে মার্চে ২০ হাজার টন ও এপ্রিলে ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে।
সূত্রমতে, এদিকে সমুদ্রপথে ২০২০ সালে বিপিসির কাছে তেল সরবরাহ শুরু করে ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (আইওসিএল)। এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ১ লাখ ৫ হাজার টন তেল আসার কথা। এর মধ্যে ডিজেল ২০ হাজার টন, ফার্নেস ৫০ হাজার টন, অকটেন ২৫ হাজার টন ও জেট ফুয়েল ১০ হাজার টন। সমুদ্রপথে ৩০ হাজার টন করে চারটি জাহাজে ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।