নিজস্ব প্রতিবেদক
আটক মাহমুদা খাতুন ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোরে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত ও বহুমুখী প্রতারণার অভিযোগে আলোচিত আওয়ামী লীগ নেত্রী মাহমুদা খাতুন ও তার ছেলে তন্ময় জামান এখন কারগারে। সাধারণ মানুষকে ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বছরের পর বছর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এই নেত্রীকে শেষ পর্যন্ত পাওনাদারদের পাতা ‘কৌশলেই’ ধরা দিতে হয়েছে। শনিবার দুপুরে যশোর শহরের বড় বাজারের এইচএমএম রোড থেকে তাদের আটক করা হয়। দীর্ঘদিন ঢাকায় গা-ঢাকা দিয়ে থাকা এই ধূর্ত নেত্রীকে যশোরে আনতে ভুক্তভোগীরা নিজেরাই ‘টোপ’ হিসেবে বিমানের টিকিট ও ভাড়ার টাকা পাঠিয়েছিলেন। আটক মাহমুদা খাতুন যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া সদুল্লাপুর গ্রামের মৃত ডাক্তার মনসুর আলীর মেয়ে। তার সাথে আটক হওয়া ছেলের নাম তন্ময় জামান। বর্তমানে তারা ঢাকার লালবাগ থানার চকবাজার এলাকার দিগু বাবু লেনে বসবাস করেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মাহমুদা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কৌশলে মানুষের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে ঢাকায় আত্মগোপন করেছিলেন। পাওনাদাররা তাকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শেষে ঘোপ সেন্ট্রাল রোডের ভুক্তভোগী দীপু খাতুনসহ কয়েকজন মিলে এক অভিনব পরিকল্পনা করেন। তারা মাহমুদাকে যশোরে আসার জন্য প্রলোভন দেখিয়ে বলেন, এখানে নতুন কিছু ইন্স্যুরেন্স ও ঋণের বড় কাজ আছে। এমনকি তাকে আশ্বস্ত করতে পাওনাদাররা নিজেরা টাকা দিয়ে মাহমুদার জন্য বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করেন এবং বিমান ভাড়া বাবদ নগদ টাকা পাঠান। বিশাল অংকের নতুন ‘শিকার’ ধরার লোভে পড়ে মাহমুদা তার ছেলে তন্ময়কে নিয়ে বিমানে করে ঢাকা থেকে যশোরে আসেন। তিনি কল্পনাও করেননি যে, যে পাওনাদারদের তিনি এড়িয়ে চলছেন, তারাই তাকে বিমানে করে সরাসরি তাদের নাগালে নিয়ে আসছেন। শনিবার দুপুরে শহরের দড়াটানা এলাকার আরএফএল শোরুমের সামনে পৌঁছানো মাত্রই ওত পেতে থাকা পাওনাদাররা তাকে ঘিরে ধরেন এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে মাহমুদা ও তার ছেলে তন্ময় জামান উল্টো পাওনাদার দীপু খাতুনের ওপর চড়াও হন এবং তাকে মারপিট করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মাহমুদা যশোরে আটক হয়েছেন—এই খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে প্রায় অর্ধশত ভুক্তভোগী ও পাওনাদার দ্রুত ঘটনাস্থলে এবং পরে কোতোয়ালি থানায় উপস্থিত হন। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মাহমুদা ও তার ছেলেকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। ভুক্তভোগীরা জানান, মাহমুদা নিজেকে আওয়ামী লীগ নেত্রী পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব ও প্রতারণার জাল বিস্তার করেছিলেন। বিশেষ করে ইন্স্যুরেন্সের নামে টাকা নেওয়া, চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং নানা সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
পালবাড়ি এলাকার সোহেল রানা পলাশ জানান, মাহমুদা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ৩৩৪ জনের কাছ থেকে সাড়ে ১২ লাখ টাকা এবং অন্য সাতজনের কাছ থেকে আরও ১৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কেশবপুরের পাজিয়া গ্রামের আতিউর রহমান জানান, মাইডাস ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে লোন পাইয়ে দেওয়ার নাম করে তার কাছ থেকে ১৬ হাজার টাকা নিয়েছেন। মাহমুদা এক সময় গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সে চাকরি করতেন। তখন থেকেই মাইডাস লাইফ, ডায়মন্ড লাইফসহ বিভিন্ন কোম্পানির নাম ভাঙিয়ে তিনি প্রতারণা করে আসছিলেন। লোন দেওয়ার কথা বলে তিনি গ্রাহকদের কাছ থেকে জামানত হিসেবে টাকা এবং একই সাথে সই করা ‘ফাঁকা চেক’ নিয়ে নিতেন। যখন গ্রাহকরা লোনের জন্য চাপ দিতেন, তখন তিনি উল্টো ওই চেক ব্যবহার করে গ্রাহকদের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিতেন। একারণে এলাকায় তিনি ‘মামলাবাজ’ হিসেবেও পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়ে উল্টো তাদেরই হয়রানি করতেন। এছাড়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি যশোর-৪ আসনের মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন এবং আলোচিত মহুয়া ক্লিনিকের মালিক খলিলের সাবেক স্ত্রী ছিলেন।
যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমেদ জানান, কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জনতা এক নারী ও তার ছেলেকে আটক করে থানায় সোপর্দ করেছে। তারা পাওনাদারদের রোষানলে পড়েছিলেন। ভুক্তভোগীদের বলা হয়েছে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ জমা দিতে। অভিযোগ প্রাপ্তি সাপেক্ষে মাহমুদা ও তার ছেলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।