ধ্রুব ডেস্ক
বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছবি: সংগৃহীত
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের হাল ধরেছিল, সেই অধ্যায় শেষ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। দেড় বছরের টালমাটাল সময় পেরিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিদায় নিচ্ছেন। উপদেষ্টারা দায়িত্ব নিয়েছিলেন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে। অনেকে একাধিক মন্ত্রণালয় সামলেছেন, একাধিক সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করেছেন।সব শেষের কথা জানিয়ে গতকাল সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দেশবাসীর উদ্দেশে তাঁর বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন। তাঁর এই শেষ ভাষণে তিনি দেশবাসীকে দিয়েগেলেন বিশেষ বার্তা। জানিয়ে গেলেন ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান। জানালেন জুলাই সনদ বিশেষ অর্জন সে কথাও।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দেশবাসীর উদ্দেশে তাঁর বিদায়ী ভাষণে বলেন, আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন শেষে নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছি। অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি ও আমার সহকর্মীরা– সবাই অঙ্গীকার রক্ষার চেষ্টা করে গেছি। কোথায় কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পেরেছি, কোথায় ব্যর্থ হয়েছি– সে বিচারের ভার আপনাদের ওপর থাকল।’
তিনি বলেন, সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে দৃঢ় থাকতে হবে। তাই ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে দল-মত, ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গত সোমবার জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ি; যেখানে সম্ভাবনা সীমাহীন, আর স্বপ্নের কোনো সীমানা নেই।
তিনি সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পরর তাঁর ও তাঁর পরিষদেরদের চ্যালেঞ্জ বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের প্রথম কাজ ছিল দেশকে সচল করা। এটা ছিল সবচাইতে কঠিন কাজ। যারা দেশকে লুটেপুটে খেত, তারাই দেশের এই যন্ত্র চালাত। তাদের একান্ত অনুগত লোক নিয়ে অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সবাই পালিয়েছে। বড় কর্তা পালিয়েছে। মাঝারি কর্তা পালিয়েছে। অন্যরা ভোল পাল্টিয়েছে। অথবা আত্মগোপনে চলে গেছে। কেউ নানাজনের সুপারিশ নিয়ে আসছে, তারা অভ্যুত্থানের গোপন সৈনিক ইত্যাদি। সরকারের ভেতরে যারা পালিয়ে যায়নি, তাদের মধ্যে কাকে বিশ্বাস করবেন, কাকে করবেন না– এটি মহাসংকট হয়ে দাঁড়াল। যতই মৃতদেহের, অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন দেহের সন্ধান আসছিল, ততই তারা চিহ্নিত হচ্ছিল।’
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘কী মহামুক্তির দিন ছিল সেদিনটি! সে কী আনন্দের দিন! বাংলাদেশিরা দেশে-বিদেশে যে যেখানে ছিল আনন্দে চোখের পানি ফেলেছিল। দৈত্যের গ্রাস থেকে তরুণ ছাত্রছাত্রীরা দেশকে বের করে এনেছে। দেশ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু দেশ সম্পূর্ণ অচল। অচল এই দেশটিকে কীভাবে সচল করা যাবে, সেটা ছিল সবার মনে। অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা ঠিক করল দেশকে সচল করার জন্য একটি সরকার লাগবে। সরকার গঠন ও চালাবার জন্য তারা আমাকে খবর দিল। আমি তখন বিদেশে। আমি দায়িত্ব নিতে রাজি না। তারা জাতির প্রতি কর্তব্য পালনের কথা বলে আমাকে রাজি করালো। এখন আমার যাওয়ার পালা।’
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা, নতুন বাংলাদেশের জন্ম। এ অর্জনের পেছনে যারা ছিলেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। গত ১৮ মাসে ক্রমান্বয়ে দেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র, কল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা, বাকস্বাধীনতা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারা, সমালোচনা করতে পারা, জবাবদিহিতায় আনতে পারার চর্চা শুরু হয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের অধিকার নিশ্চিত হলো। এই ধারা যেন কোনো রকমেই হাতছাড়া হয়ে না যায়। নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করায় এ সময় তিনি দেশের সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্মিলিতভাবে একটি প্রশংসনীয় নজির সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত– এই নির্বাচন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে।
অধ্যাপক ইউনূস সশস্ত্র বাহিনীর সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী এক উত্তাল সময়ে দেশকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সৈন্যরা যে ধৈর্য, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন, তার জন্য দেশবাসীর পক্ষ থেকে আমি তাদের প্রত্যেককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
জুলাই সনদকে বিশেষ অর্জন উল্লেখ করেন তিনি তাঁর বক্তব্যে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন জুলাই সনদ, যার ভিত্তিতে গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দিয়েছে দেশের মানুষ। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আশা করব, এটা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন হবে।
নতজানু পররাষ্ট্রনীতি কিংবা অন্য দেশের নির্দেশনা ও পরামর্শনির্ভর বাংলাদেশ এখন আর নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, আজকের বাংলাদেশ নিজের স্বাধীন স্বার্থ রক্ষায় আত্মবিশ্বাসী, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল। বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম– এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আজ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বিদায়ী ভাষণে আঞ্চলিক অখণ্ডতা, সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা ও আগ্রাসন মোকাবেলায় এর গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া হলেও বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় বহির্বিশ্বের সম্ভাব্য হুমকি ও আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার তার সীমিত মেয়াদের মধ্যে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতের নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারগুলোও অব্যাহত রাখবে; যাতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করা যায়। আমাদের খোলা সমুদ্র কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়– এটি বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার উন্মুক্ত দরজা। নেপাল, ভুটান ও সেভেন সিস্টার্সকে নিয়ে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, বাণিজ্যিক চুক্তি ও শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশের সুযোগের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে একটি বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার শক্তিশালী ভিত্তি প্রতিষ্ঠিতহবে।
তিনি বাংলাদেশ- যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তির বিষয়েও কথা বলেন। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও শুল্ক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই চুক্তি শুধু একটি বাণিজ্যিক সুবিধা নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে দীর্ঘ মেয়াদে শক্তিশালী করার জন্য একটি কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য পারস্পরিক শুল্কভার রেসিপরোকাল ট্যারিফ ৩৭% থেকে ১৯%-এ কমে এসেছে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যে বাংলাদেশ শুধু স্বল্পমূল্যের শ্রমনির্ভর অর্থনীতি নয়, বরং দক্ষতা ও প্রযুক্তি ও মূল্য সংযোজনভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে। তবে স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততার বিকল্প নেই।