ধ্রুব নিউজ ডেস্ক
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বা এক্সচেঞ্জ ‘বাইন্যান্স’ ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম ‘বাইন্যান্স’-এ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে। প্ল্যাটফর্মটির সিস্টেম থেকে রেকর্ড ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন (৬৩০ কোটি) মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ লুটে নিয়েছে হ্যাকাররা। তবে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় এর প্রায় অর্ধেক বা প্রায় অর্ধেক সম্পদ এরই মধ্যে জব্দ করা সম্ভব হয়েছে।
নজিরবিহীন এই সাইবার আক্রমণ ক্রিপ্টো বাজারে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং ডিজিটাল সম্পদে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আমেরিকার বিখ্যাত ব্লকচেইন অ্যানালাইসিস প্রতিষ্ঠান ‘টিআরএম ল্যাবস’ ও ‘চেইনালাইসিস’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই বিশাল সাইবার হামলার নেপথ্যে রয়েছে উত্তর কোরিয়ার কুখ্যাত হ্যাকার গোষ্ঠী।
বাইন্যান্সের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জানানো হয়েছে, একজন ডেভঅপস (DevOps) প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাকিংয়ের কবলে পড়ার কারণে এই বিপর্যয় ঘটে থাকতে পারে। হ্যাকাররা ওই প্রকৌশলীর ডিভাইসের মাধ্যমে সার্ভিস কনটেইনারে প্রবেশ করে এবং কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই ক্রিপ্টো উত্তোলনের লেনদেন সম্পন্ন করে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, ব্যবহারকারীদের মূল ওয়ালেটের প্রাইভেট-কি বা পাসওয়ার্ড চুরির কোনো প্রমাণ মেলেনি। সম্পূর্ণ তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত প্রযুক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হবে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিকভাবে বাইন্যান্স তাদের প্ল্যাটফর্মে সমস্ত ধরনের ডিপোজিট ও উইথড্রল (জমা ও উত্তোলন) সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রযুক্তি খাতের অংশীদারদের নিয়ে জোরদার নিরাপত্তা পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, তাদের ব্লকচেইনে থাকা প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ ইতিমধ্যে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও তহবিল শনাক্ত ও অবরুদ্ধ করতে অন্যান্য ব্লকচেইন অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চলছে।
এই সাইবার হামলার পর সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে শীর্ষ স্ট্যাবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও। টেথারের (Tether) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পাওলো আরদোইনো জানিয়েছেন, হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িত প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ তারা অবরুদ্ধ করেছেন। এছাড়া সার্কেলের (Circle) সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জেরমি অ্যালেয়ার জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে তারা ৮০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ফ্রিজ করেছেন।
বাইন্যান্সের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, গ্রাহকদের তহবিল সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রয়েছে। তাদের নিরাপত্তা টিম প্রতিটি তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করছে।
এদিকে, ২০২৩ সালে পদত্যাগ করা বাইন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সিইও চ্যাংপেন ঝাও এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জানিয়েছেন, তিনি বর্তমানে সরাসরি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা না করলেও একজন প্রধান শেয়ারহোল্ডার হিসেবে নিশ্চিত করছেন যে গ্রাহকদের অর্থ পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে। উল্লেখ্য, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের অভিযোগে ঝাও ২০২৩ সালে পদ ছাড়লেও, পরবর্তীতে ২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে বিশেষ ক্ষমা প্রদর্শন করেন।
এই নজিরবিহীন হ্যাকিংয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো ক্রিপ্টোকারেন্সি মার্কেটে। ঘটনার পর পরই শীর্ষ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনের দাম ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমে ৭৯ হাজার মার্কিন ডলারের নিচে নেমে গেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে দ্রুত প্রসার লাভ করে বাইন্যান্স বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ডিজিটাল সম্পদ লেনদেন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ঘটনা ক্রিপ্টো নিরাপত্তার ইতিহাসে অন্যতম বড় একটি ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।