তহীদ মনি
ছবি: এআই প্রণীত
মৃতপ্রায় বেতনা ও কপোতাক্ষ নদের নাব্য ফিরিয়ে আনতে প্রথম পর্যায়ে নদী পুনঃখনন ও সংযোগ চ্যানেল তৈরিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৬৯ কোটি ৭১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা।
উজান থেকে ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে দীর্ঘ চার দশক ধরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দেখা দেওয়া মরুকরণ প্রক্রিয়া ও নদীর নাব্যাসংকট কাটাতে বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। গঙ্গা নদীভিত্তিক পানির সঠিক ব্যবহার ও নদী পুনরুজ্জীবনে নেওয়া হচ্ছে সাড়ে ৩৪ হাজার কোটি টাকার ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প (১ম পর্যায়)’। এই মহাপরিকল্পনার সরাসরি সুফল পেতে যাচ্ছে যশোরসহ দক্ষিণ ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ।
প্রকল্পের আওতায় যশোর অঞ্চলের প্রাণ হিসেবে পরিচিত মৃতপ্রায় বেতনা ও কপোতাক্ষ নদের নাব্য ফিরিয়ে আনতে প্রথম পর্যায়ে নদী পুনঃখনন ও সংযোগ চ্যানেল তৈরিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৬৯ কোটি ৭১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। এই অর্থ দিয়ে যশোরের প্রায় ৩৪ কিলোমিটার নদী ও ক্যানেল সংস্কার করা হবে, যার মধ্যে কেবল বেতনা নদীরই ২৫ কিলোমিটার অংশে চার ধাপে চলবে খনন কাজ।
ফারাক্কার চার দশকের ক্ষ ক্ষত ও পদ্মা ব্যারাজের ব্যাকগ্রাউন্ড
১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলশ্রুতিতে যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো পলি জমে ভরাট হতে থাকে। স্রোতহীন হয়ে পড়ে প্রমত্তা নদীগুলো, বৃদ্ধি পায় ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা এবং বর্ষায় সৃষ্টি হয় দীর্ঘমেয়াদি ভবদাহের মতো অভিশাপতুল্য জলাবদ্ধতা।
এ সংকট দূর করতেই রাজবাড়ী ও পাবনা জেলার সীমান্তে পদ্মার ওপর ব্যারাজটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ব্যারাজ বর্ষা মৌসুমে ২৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি ধরে রাখবে এবং শুষ্ক মৌসুমে তা নিয়ন্ত্রিত উপায়ে শাখা নদীগুলোতে প্রবাহিত করবে। এতে শুষ্ক মৌসুমেও নদীগুলোতে প্রায় ৮০০ কিউসেক পানিপ্রবাহ বহমান থাকবে, যা ক্ষতিকর লবণাক্ততা কমিয়ে নদীগুলোর স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান ফিরিয়ে আনবে।
যশোরে ১৭০ কোটি টাকার কাজের খাতওয়ারি রূপরেখা
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের অধীনে মোট ৩৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে খনন ও সংযোগ কাজ পরিচালনা করা হবে:
শার্শায় বেতনা নদী পুনঃখনন
বেতনা নদীর নাব্যতা ও স্রোত ফিরিয়ে আনতে শার্শা উপজেলার ২৫ কিলোমিটার অংশে চার ধাপে খননকাজ চলবে। এর মধ্যে ৭ কিমি, ৬.৫ কিমি, ৬ কিমি এবং ৫.৫ কিমি দৈর্ঘ্যের আলাদা অংশে ব্যয় ধরা হয়েছে যথাক্রমে ২৭ কোটি, ২৫ কোটি ৭ লাখ, ২৩ কোটি ১৪ লাখ এবং ২১ কোটি ২১ লাখ টাকা (মোট ৯৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা)।
চৌগাছায় কপোতাক্ষের ডাইভারশন চ্যানেল: কপোতাক্ষ নদের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে চৌগাছা উপজেলায় ৩টি অংশে মোট ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার ডাইভারশন চ্যানেল পুনঃখনন করা হবে। এতে খরচ ধরা হয়েছে যথাক্রমে ১৬ কোটি ৯৮ লাখ, ১০ কোটি ৭৯ লাখ এবং ২৭ কোটি ৬ লাখ টাকা (মোট ৫৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা)।
ঝিকরগাছায় নতুন সংযোগ চ্যানেল
কপোতাক্ষ নদ ও বেতনা নদীর মধ্যে পানির ভারসাম্য ধরে রাখতে ঝিকরগাছায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি লিংক বা সংযোগ চ্যানেল খনন করা হবে, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ১৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
কৃষি ও মৎস্য খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের হিসাব প্রকল্পের নথি ও পাউবোর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প চালু হলে পুরো অঞ্চলের কৃষিকাঠামোয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। ব্যারাজের সহায়তায় প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সুপেয় পানির সেচ নিশ্চিত করা যাবে। সার্বিকভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ লাখ টন ধান এবং সোয়া দুই লাখ টন মাছের নতুন উৎপাদন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ব্যারাজ থেকে অতিরিক্ত ১১৩ মেগাওয়াট পরিবেশবান্ধব জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখবে। সুন্দরবনের সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্যও পাবে নতুন সুরক্ষাবলয়।
জলাবদ্ধতা মুক্তি ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা
প্রকল্পের প্রাক-জরিপ কাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দারা ও পরিবেশকর্মীরা মনে করছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে যশোর অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অভিশাপ কপোতাক্ষ ও বেতনার পলি ভরাট সমস্যার চিরস্থায়ী অবসান ঘটবে। জোয়ার-ভাটা পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকট দূর হবে এবং বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হওয়ায় জলাবদ্ধতা আর কৃষকের দীর্ঘশ্বাস হবে না।
পাউবোর বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ
দৃষ্টিভঙ্গি যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, "পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে যশোরের প্রায় ৩৪ কিলোমিটার নদী ও ডাইভারশন চ্যানেল সংস্কার করা গেলে তা এ জেলার কৃষি ও অর্থনীতিতে আশীর্বাদ হয়ে আসবে। শুষ্ক মৌসুমে স্রোতহীন, মরা কঙ্কালসার নদীর যে চিত্র আমরা বছরের পর বছর দেখে অভ্যস্ত, তার বদলে আমরা দেখতে পাবো একটি প্রবহমান নদী ব্যবস্থা। রক্ষা পাবে আমাদের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ।"