বিশেষ প্রতিবেদক
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
যশোরের শার্শা উপজেলার সোনামুখো বিলে ‘এ এফ মৎস্য খামারে’ সাড়ে ১৫ কোটি টাকার মাছ মারা যাওয়ার পেছনে বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে দায় দিয়েছেন খামার মালিক। তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, ওই দিন সারাদিনে লোডশেডিং ছিল মাত্র ৪০ মিনিট, যা দিয়ে এত বড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটা বাস্তবসম্মত নয়। লোডশেডিংয়ে বিপুল পরিমাণ এই মাছের মৃত্যুর দাবি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এবং মূল ঘটনা খতিয়ে দেখতে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
খামার মালিক আলফাজুল হক ও ফারুক হোসেন জানান, বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়পুর-সোনামুখো বিলে ২০০ বিঘার ঘেরটিতে তারা যৌথভাবে ‘এ এফ মৎস্য খামার’ গড়ে তোলেন। এতে প্রায় ৬০ লাখ পাবদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়েছিল। গত ২২ আগস্ট (শুক্রবার) দিবাগত রাতে হঠাৎ মাছের মড়ক শুরু হয় এবং শনিবার সকালে বিপুল পরিমাণ মৃত মাছ পানিতে ভেসে ওঠে।
খামারিদের দাবি, রাত ১টার পর ঘন ঘন ও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ঘেরে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা (অ্যারেটর) ব্যাহত হয়। এর সঙ্গে বৈরী আবহাওয়া যোগ হওয়ায় পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়। এতে প্রতি ১৫টিতে এক কেজি ওজনের প্রায় ১০ হাজার মণ পাবদা মাছ মারা যায়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১৫ কোটি টাকা। অন্যান্য মাছসহ মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকা।
খামার মালিক আলফাজুল হক বলেন, "মাছের খাদ্য বাবদ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বিক্রির উপযোগী এই মাছগুলো ভারতে রপ্তানির প্রক্রিয়া চলছিল। কিন্তু এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেল।" অপর খামারি ফারুক হোসেন জানান, এই খামারের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০০টি পরিবার নির্ভরশীল ছিল।
তবে খামার মালিকের এই দাবি যুক্তিসঙ্গত নয় বলে দাপ্তরিক পত্রে স্পষ্ট করেছে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১। সোমবার (২৪ আগস্ট) স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান জানান, শার্শা-১ উপকেন্দ্রের ৩ নম্বর ফিডার হতে ২২ আগস্ট দিবাগত রাতে ১:৪০ মিনিট থেকে ২:২০ মিনিট পর্যন্ত মাত্র ৪০ মিনিট লোডশেডিং ছিল। অথচ রাত ১১:৩০ মিনিট থেকেই ঘেরে মাছ ভেসে ওঠার কথা খামারি নিজেই স্বীকার করেছেন।
পল্লী বিদ্যুতের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র ৪০ মিনিটের বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পুরো ঘেরের মাছ একযোগে মারা যাওয়া কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। একই ফিডারের অধীনে থাকা আরও ১২টি মৎস্য ঘেরে কোনো সমস্যা হয়নি। তাছাড়া নিজস্ব কোনো বিকল্প জেনারেটর ব্যবস্থা না রেখে খামারিদের অযত্ন ও অবহেলার কারণেই এই ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে বলে তারা উল্লেখ করেন।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যাওয়ার দাবিটি খতিয়ে দেখতে এবং প্রকৃত কারণ উদঘাটনে স্বপ্রণোদিত হয়ে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান।
শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) আহ্বায়ক করে গঠিত এ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নাভারণ সার্কেল, শার্শা), উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (শার্শা), নির্বাহী প্রকৌশলী (ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিঃ, বিতরণ বিভাগ-১, যশোর) ও উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা (শার্শা)।
গঠিত তদন্ত কমিটিকে আগামী ২ কার্যদিবসের মধ্যে সরেজমিনে তদন্ত সম্পন্ন করে ঘটনার আসল রহস্য উদঘাটন, মিডিয়ায় প্রচারিত তথ্যের সত্যতা যাচাই ও দায়দায়িত্ব নিরূপণপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।