আবু মুয়াজ মাসুম বিল্লাহ
সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় 'ভোট' শব্দটি কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি আত্মপরিচয় ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাধিকার নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে যে আক্ষেপ, অনিশ্চয়তা ও আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা সমাজকাঠামোয় এক গভীর নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যখন কোনো জাতির সামনে রাষ্ট্র সংস্কার ও ইনসাফ কায়েমের নতুন সুযোগ আসে, তখন সেই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়ায় নাগরিকের সচেতন অংশগ্রহণ। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ভোটের ধর্মীয় ও নৈতিক তাৎপর্য বোঝা অপরিহার্য। ভোট মানে কেবল একটি ছোট্ট কাগজে সিল মারা নয়; ভোট হচ্ছে বিবেক দিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার নাম, ইতিহাসের সামনে দায় স্বীকার এবং স্রষ্টার সামনে এক নীরব প্রতিশ্রুতি।
যে সমাজে শাসনক্ষমতা জনগণের মতামতের উপর নির্ভরশীল, সেখানে ভোট শুধুমাত্র ইসলামের আলোকে নাগরিক অধিকারই নয়, বরং এটি আমানত রক্ষা করার একটি বিশাল প্রক্রিয়া। ইসলাম মানুষের জীবনকে দায়িত্বশীল করেছে। কুরআন মাজিদ থেকে আমরা জানতে পারি ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব কোনো খেলনার বিষয় নয়; এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের উপর অর্পিত পরীক্ষা। আর ভোট সেই পরীক্ষার প্রথম ধাপ।
ভোট: আমানত ও সাক্ষ্যের মিলনবিন্দু
আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন আমানতসমূহ যথাযথভাবে আদায় করতে।” (সূরা নিসা: ৫৮)। রাষ্ট্র পরিচালনার ভার কাকে দেওয়া হবে এ বিষয়ে মত প্রকাশের মাধ্যমই হলো ভোট। সুতরাং ভোট একটি আমানত হস্তান্তরের দলিল। একই সঙ্গে ভোট হলো সাক্ষ্য। কুরআন সাক্ষ্য গোপন বা বিকৃত করাকে অন্তরের গুনাহ বলে আখ্যায়িত করেছে। ভোট দিয়ে একজন মানুষ কার্যত ঘোষণা করে— ‘আমি এই ব্যক্তিকে, এই নীতিকে, এই পথে দেশ পরিচালনার জন্য উপযুক্ত মনে করি।’ ভুল বা স্বার্থান্বেষী ভোট মানে মিথ্যা সাক্ষ্যের বোঝা বহন করা।
সুন্নাহ ও নেতৃত্বের মানদণ্ড
রাসূলুল্লাহ (সা.) নেতৃত্বের প্রশ্নে ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক। তিনি ক্ষমতার লোভকে দুর্বলতার আলামত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। হাদিসে এসেছে, “যখন দায়িত্ব অযোগ্যদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, তখন ধ্বংস অনিবার্য।” ভোটের মাধ্যমে যদি আমরা নৈতিকতাহীনতা, দুর্নীতি বা জুলুমকে বৈধতা দিই, তবে সেই ধ্বংসের অংশীদারিত্ব আমাদের ঘাড়েই বর্তায়। ইসলামের দৃষ্টিতে ভালো মুসলিম মানে কেবল নামাজি ব্যক্তি নয়; বরং ভালো মানুষ তারাই যারা ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সচেতন।
নৈতিক ভোট: নিয়ত, জ্ঞান ও সাহস
ইসলামী নৈতিকতার ভিত্তি তিনটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে: নিয়ত, ইলম এবং ইনসাফ।
১. নিয়ত: ব্যক্তিগত লাভ, দলীয় মোহ বা আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে নিয়ত হতে হবে জনস্বার্থকেন্দ্রিক।
২. ইলম: অন্ধ বিশ্বাস নয়; প্রার্থী, তাঁর আদর্শ ও সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা অর্জন করা।
৩. ইনসাফ: নিজের পছন্দের বিরুদ্ধে হলেও সত্যকে সমর্থন করার মানসিক দৃঢ়তা রাখা।
আল্লাহ বলেন, “ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকো, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে যায়।” (সূরা নিসা: ১৩৫)।
বাস্তবতায় ভোটের তাৎপর্য
আমাদের প্রেক্ষাপটে ভোট মানে কেবল ক্ষমতা বদল নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগ্য নির্ধারণ। একটি সঠিক ভোট শিক্ষাব্যবস্থাকে আলোকিত করতে পারে, বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে; আবার একটি ভুল ভোট দীর্ঘদিনের ভোগান্তির বীজ বপন করতে পারে। এখানে ভোটারদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভয়, গুজব ও আবেগ। ইসলাম এই তিনটির বিপরীতে দাঁড়াতে শেখায় তাওয়াক্কুল, সত্য যাচাই ও সংযম দিয়ে। নীরবতা অনেক সময় জুলুমের নীরব সহযোগী হয়ে ওঠে। এই উপলব্ধি একজন মুসলিম ভোটারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভোট বর্জন: দায়িত্ব এড়ানো নাকি কৌশল?
ইসলামের দৃষ্টিতে যেখানে ভোটের মাধ্যমে অন্যায় কমানো ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার বাস্তব সুযোগ আছে, সেখানে ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। কারণ রাসূল (সা.) বলেছেন, অন্যায় দেখলে তা প্রতিহিত করো। ভোট অনেক সময় সেই প্রতিহত করার সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও কার্যকর মাধ্যম। তাই সচেতনভাবে ভোট থেকে দূরে থাকা মানে অযোগ্যদের পথ প্রশস্ত করে দেওয়া।
উপসংহার
ভোট এমন একটি সিদ্ধান্ত, যার প্রতিধ্বনি দুনিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে আখিরাত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একজন প্রকৃত মুসলিম ভোটার জানেন, আজ ব্যালটে যে চিহ্ন এঁকে দিচ্ছেন, কাল তার হিসাব দিতে হবে। তাই ভোট দিতে হবে লোভে নয়, বরং স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য ও সৃষ্টির প্রতি দয়া নিয়ে। ভোট দিতে হবে ভয় জয় করে নিজের বিবেক দিয়ে। এটি শুধু ব্যালট বাক্সের সামনে দাঁড়ানো নয়, বরং আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি।
লেখক: খতিব ও আলেমে দীন