আল জাজিরা
উত্তাল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। ছবি: সংগৃহীত
বোর্ডের প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বড় কেলেঙ্কারির পর এবার কঠোর সংস্কার ও জবাবদিহির দাবিতে উত্তাল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। তরুণদের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন 'কাকরোচ জনতা পার্টি'র (সিজেপি) ডাকে কেন্দ্রীয় সরকারের নানা বিধিনিষেধ ও পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে পার্লামেন্ট ঘেরাও অভিযানে নেমেছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী।
দুই দিনের মানসিক প্রস্তুতি শেষে সোমবার ভোরে গুরুগ্রাম থেকে দিল্লির যন্তর মন্তরের উদ্দেশ্যে রওনা হন ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অংশুকা রুথ দাস। তাঁর সাথে আসা বন্ধুদের কাগজের ব্যাগে লুকানো ছিল ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার এবং জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় চরম দুর্নীতির অবসান দাবির প্ল্যাকার্ড।
এই তরুণীরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ানো হাজারো বিক্ষোভকারীর একাংশ। চলতি বছরের শুরুতে মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা (এনইইটি) প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারির পর এ পর্যন্ত অন্ততঃ ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। ক্ষুব্ধ অংশুকা বলেন, "যে সব ছেলেমেয়ে বাধ্য হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে, আমরা আজ তাদের প্রতিনিধিত্ব করতেই এখানে এসেছি।"
প্রতি বছর ভারতে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থী এনইইটি পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু এবার প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি সরকার নিশ্চিত করার পর মাসব্যাপী কঠিন পরিশ্রম করা পরীক্ষার্থীদের আবার পুনঃপরীক্ষায় বসতে বাধ্য করা হয়। এই জাতীয় কেলেঙ্কারির পরেই আবির্ভাব ঘটে সিজেপি নামক আন্দোলনটির।
মূলত এক বিচারক বেকার তরুণদের 'কাকরোচ' বা তেলাপোকার সাথে তুলনা করলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মকভাবে এই পেজের যাত্রা শুরু হয়। তবে দ্রুতই তা ভারতের ক্ষুব্ধ তরুণ সমাজের সাথে মিশে যায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কোটি কোটি তরুণ এর অনুসারী হয়ে ওঠেন, যা এমনকি দলটির উদ্যোক্তাদেরও অবাক করে দেয়।
সংগঠনটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তরুণদের সংগঠিত করার পাশাপাশি সিজেপির প্রধান দাবি এখন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। আন্দোলনে যোগ দিয়ে অংশুকা দাস স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "আমরা বিচার চাই। প্রচলিত যে ব্যবস্থা আমাদের ভালো কলেজে মেধা অনুযায়ী আসন নিশ্চিত করতে পারে না, তা বদলে ফেলতে হবে। আমি আমার মাকে বলেই এসেছি—বিক্ষোভ করা আমার অধিকার। আজ না দাঁড়ালে এই সুযোগ আর কোনোদিন আসবে না।"
বিক্ষোভকারীরা রাতভর যন্তর মন্তরে জমায়েত হয়ে পার্লামেন্টের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে পুরো কেন্দ্রীয় দিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থা জারি করে পুলিশ। বন্ধ করে দেওয়া হয় মেট্রোরেল স্টেশন, বসানো হয় ব্যারিকেড এবং সীমিত করা হয় ইন্টারনেট সেবা।
দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শচীন শর্মা বিক্ষোভকারীদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করেন। কিন্তু মিছিল এগোতেই পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ শুরু করে। বহু বিক্ষোভকারীকে জোরপূর্বক পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিহার থেকে আসা ২৬ বছর বয়সী ব্যবস্থাপনা বিভাগের স্নাতক মোহাম্মদ আনিস বলেন, "আমাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ছিল। হঠাতই টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ শুরু হলে মানুষ আতঙ্কে ছুটতে শুরু করে। আমার হাত কেটে গেছে। তবে এই আঘাত আর ক্লান্তি সত্ত্বেও আমি বিশ্বাস করি—অন্যায়ের মুখে চুপ থাকা মানে তাকে প্রশ্রয় দেওয়া।"
এর আগে গত শনিবার টানা ২০ দিন অনশনরত ৫৮ বছর বয়সী প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে যন্তর মন্তর থেকে বলপূর্বক তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ, যাকে বিক্ষোভকারীরা সম্পূর্ণ বেআইনি আটক বলে অভিযোগ করেছেন।
ভারতের অভিজ্ঞ রাজনীতি বিশ্লেষক সাবা নকভি মনে করেন, সরকারের এ ধরনের দমনপীড়ন উল্টো ক্ষোভ বাড়াবে। তিনি বলেন, "ভারতে এখন সফটওয়্যার খাতের কাঙ্ক্ষিত চাকরিগুলো দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে, আর একই সাথে বাড়ছে বেকারত্ব ও বৈষম্য। যে অঞ্চলগুলো বিজেপিকে বেশি ভোট দেয়, সেখানেই এই সমস্যাগুলো সবচেয়ে প্রকট। এ যাবৎ এ থেকে রেহাই পেলেও এখন শাসকদলকে এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হচ্ছে।"
এদিকে সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস জানিয়েছেন, সরকার তাঁদের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে এবং দুজন প্রতিনিধিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার সাথে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক গবেষক অসীম আলীর মতে, আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনার এই সম্মতি প্রকাশ সরকারের কিছুটা ব্যাকফুটে যাওয়ারই লক্ষণ। তবে এ দিয়ে দ্রুত সমাধান পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাঁর মতে, বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের মতো ভারতের এই আন্দোলনটির পরিধিও কেবল শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না থেকে সার্বিক বেকারত্ব প্রশ্নে রূপ নিয়েছে, যা মূলত মোদি সরকারের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছে।
উত্তরপ্রদেশের গাজীপুর থেকে আসা ২০ বছর বয়সী নারী বিক্ষোভকারী অঞ্জনি কুমারীর ভাষায় এটি মোদি সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার এক বিরল সুযোগ। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, "শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা এই রাজপথ ছাড়ছি না। আমাদের কাছে এটা—এখনই, না হলে আর কখনোই নয়।"