এড মিলিব্যান্ড, শাবানা মাহমুদ এবং জন হিলি-কে মন্ত্রীসভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ গুলো দেওয়া হয়েছে
ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই নিজের নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ শুরু করেছেন অ্যান্ডি বার্নহাম। ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশের আগ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার তালিকা নিয়ে তিনি কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলেন। শপথ বা ঘোষণার আগে কোনো তথ্য প্রকাশ না করায় চ্যান্সেলর কে হতে যাচ্ছেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়। অবশেষে জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বার্নহাম তার নতুন টিমের সদস্যদের নাম ঘোষণা শুরু করেছেন, যেখানে বড় ধরনের পরিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ দেখা যাচ্ছে।
অ্যান্ডি বার্নহামের নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম নিয়োগ হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছে জন হিলি।কিয়ার স্টারমারের সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জন হিলি সম্প্রতি প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে ট্রেজারির ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে পদত্যাগ করেছিলেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত গর্ডন ব্রাউনের সহকারী হিসেবে ট্রেজারিতে কাজ করার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হিলির এই পদোন্নতিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বড় ধরনের বিস্ময় হিসেবে দেখছেন। কারণ, অনেকেই ধারণা করেছিলেন এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি এড মিলিব্যান্ড বা শবানা মাহমুদের হাতে যেতে পারে।
পুরনো দায়িত্বেই বহাল যারা
নতুন সরকারে ওপরের সারির সামান্য কয়েকজন মন্ত্রী তাদের পদ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন:
- শাবানা মাহমুদ: হোম সেক্রেটারি হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন এই ব্লু লেবার ঘরানার নেত্রী। নতুন প্রধানমন্ত্রী বার্নহামও উপ-নির্বাচনে তার অভিবাসন নীতির সমর্থন করেছিলেন। তবে অভিবাসনে কঠোর অবস্থানের কারণে নতুন সরকার শুরুতেই বামপন্থীদের সমালোচনার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
- লিসা নন্দী: সংস্কৃতি মন্ত্রীর পদ ধরে রেখেছেন তিনি। বার্নহামের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত নন্দী তার এই পদ রিটেইন করায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
- প্যাট ম্যাকফ্যাডেন: ওয়েলফেয়ার ও পেনশন বিষয়ক তদারকির দায়িত্বে বহাল রাখা হয়েছে তাকে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এড মিলিব্যান্ড
প্রাক্তন লেবার নেতা এড মিলিব্যান্ডকে অর্থমন্ত্রী করার গুঞ্জন থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর (ফরেন সেক্রেটারি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করবেন তিনি। তবে ২০১৩ সালে সিরিয়ায় সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বিরোধীরা ইতোমধ্যেই তার ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
বার্নহামের অনুগতদের উত্থান
- লুইজ হাইগ: অ্যান্ডি বার্নহামের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনুগত হিসেবে পরিচিত লুইজ হাইগকে একযোগে ফার্স্ট সেক্রেটারি অব স্টেট, চ্যান্সেলর অব দ্য ডাচি অব ল্যাঙ্কাস্টার এবং ক্যাবিনেট অফিস মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যদিও তিনি তথাকথিত 'ফোর গ্রেট অফিস অব স্টেট'-এর কোনোটি পাননি, তবুও সরকারের অন্যতম নীতি-নির্ধারক হিসেবে তিনি আবির্ভূত হলেন।
- ইভেট কুপার: অভিজ্ঞ এই নেত্রীকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দ্য ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) ও সোশ্যাল কেয়ার খাতের সংস্কারই হবে তার মূল চ্যালেঞ্জ।
- ওয়েস স্ট্রিটিং: স্টারমারের নেতৃত্ব থেকে আস্থা হারিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর পদ ছাড়া ওয়েস স্ট্রিটিংকে নতুন মন্ত্রিসভায় আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
- অ্যাঞ্জেলা রায়নার: ট্যাক্স সংক্রান্ত জটিলতায় গত সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করা অ্যাঞ্জেলা রায়নারকে পুনরায় আবাসন মন্ত্রীর (হাউজিং সেক্রেটারি) পদ দেওয়া হয়েছে।
- জোনাথন রেনল্ডস: বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। তার অধীনে বাণিজ্য বিভাগের নাম পুনর্নির্ধারণ করে ‘ডিপার্টমেন্ট ফর বিজনেস, ইনোভেশন, সায়েন্স অ্যান্ড ট্রেড’ করা হয়েছে।
- অন্যান্য নিয়োগ: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লুসি পাওয়েল, এনভায়রনমেন্ট সেক্রেটারি পদে ডেম অ্যাঞ্জেলা ইগল, জাস্টিস সেক্রেটারি হিসেবে অ্যালেক্স নরিস, নেট জিরো সেক্রেটারি হিসেবে মিয়াটা ফানবুল্লে, চিফ হুইপ পদে অ্যানেলিস মিডগ্লে এবং অ্যাটর্নি জেনারেল পদে এলাই রিয়েভসকে মনোনীত করা হয়েছে। এছাড়া ট্রান্সপোর্ট সেক্রেটারি পদে হেইডি আলেকজান্ডার, স্কটল্যান্ড সেক্রেটারি পদে ডগলাস আলেকজান্ডার, ওয়েলস সেক্রেটারি পদে স্টিফেন কিনক এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড সেক্রেটারি পদে ক্রিস ব্রায়ান্ট তাদের নতুন মিশন শুরু করছেন।
মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়লেন যারা
অ্যান্ডি বার্নহাম তার নিজস্ব টিম গুছিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় কিয়ার স্টারমারের অনুগত ও সরকারের অনেক হেভিওয়েট নেতা পদ হারিয়েছেন:
- রাচেল রিভস: যুক্তরাজ্যের চ্যান্সেলর হিসেবে কাজ করা রাচেল রিভস তার বিদায়ী বার্তায় বলেছেন, বিদায় নিলেও দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তিনি গর্বিত এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী ও তার টিমকে সমর্থন জানিয়ে যাবেন।
- ডেভিড ল্যামি: সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও যুক্তরাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ উপ-প্রধানমন্ত্রী পদ হারিয়ে আবেগঘন বার্তা দিয়ে নতুন সরকারের সাফল্য কামনা করেছেন।
- লর্ড হারমার: স্টারমারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও অ্যাটর্নি জেনারেল লর্ড হারমার পদ হারিয়েছেন এবং ব্যাকবেঞ্চে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
- পিটার কাইল ও লিজ কেন্ডাল: বিদায়ী বাণিজ্য মন্ত্রী পিটার কাইল এবং সায়েন্স ও টেকনোলজি মন্ত্রীর দায়িত্ব সামলানো লিজ কেন্ডাল পদ হারিয়েছেন।
- অন্যান্য বাদ পড়া নাম: পরিবেশ ও আবাসন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করা স্টিভ রিড, কারাগার বিষয়ক মন্ত্রী লর্ড টিম্পসন, ওয়েলস সেক্রেটারি জো স্টিভেন্স, ডাচি অব ল্যাঙ্কাস্টারের সাবেক চ্যান্সেলর ড্যারেন জোন্স, উত্তর আয়ারল্যান্ড সেক্রেটারি হিলারি বেন এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন মন্ত্রী ব্যারনেস চ্যাপম্যান বিদায় নিয়েছেন।
নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের এই অভিজ্ঞ ও নতুন মুখের মেলবন্ধনে গঠিত মন্ত্রিসভা যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় কতটা সফল হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।