আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সাবেক প্রধান ইয়াহইয়া সিনওয়ারের স্থলাভিষিক্ত হলেন খলিল আল-হাইয়া ছবি: এ এফ পি
দীর্ঘ টানাপোড়েন ও অভ্যন্তরীণ ভোটের পর ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের নতুন প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন খলিল আল-হাইয়া (৬৫)। ২০২৪ সালের অক্টোবরে সাবেক প্রধান ইয়াহইয়া সিনওয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হওয়ার পর শূন্য হওয়া পদে তার স্থলাভিষিক্ত হলেন ইরানঘেঁষা হিসেবে পরিচিত এই প্রবীণ নেতা। পর পর চারটি ছেলেকে ইসরায়েলি বিমান হামলায় হারানোর পর ব্যক্তিগত শোককে সঙ্গে নিয়েই হামাসের শীর্ষ চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটলো তার।
সংগঠনটির সর্বোচ্চ পরিচালনা পরিষদ থেকে নতুন নেতা নির্বাচনের ভোটপ্রক্রিয়া শুরু হয় চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে। তবে ইরান ও লেবাননের সামরিক পরিস্থিতি এবং গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্রতার কারণে একাধিকবার এই নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হয়। গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, ইসরায়েলের কারাগারে থাকা সদস্য এবং নির্বাসিত নেতৃত্বের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত পরিষদ প্রথম ধাপে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিতে ব্যর্থ হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী খালিদ মাশালের সঙ্গে আল-হাইয়ার এই লড়াই মূলত সংগঠনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে দুটি ভিন্ন মতাদর্শের সংঘর্ষকে সামনে এনে দেয়। একদিকে ছিলেন ইরান-নির্ভরতা বজায় রেখে সিনওয়ারের নীতিকে অব্যাহত রাখার পক্ষে আল-হাইয়া, অন্যদিকে ছিলেন হামাসের কৌশলে বড় পরিবর্তনের পক্ষপাতী খালিদ মাশাল। শেষ পর্যন্ত রান-অফ ভোটে বিজয়ী হন আল-হাইয়া। এই জয়ের ফলে সিনওয়ারের মৃত্যুর পর গঠিত পাঁচ সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ ভেঙে দিয়ে শিগগিরই ইস্তাম্বুলে বৈঠক ডেকে সংগঠনের নির্বাহী কাঠামো নতুন করে গঠন করা হবে।
আল-হাইয়ার ব্যক্তিগত জীবন ইসরায়েলি বিমান হামলার ক্ষত দিয়ে চিহ্নিত। গত বছর সেপ্টেম্বরে দোহার যে ভবনটিতে হামাসের প্রতিনিধি দল অবস্থান করছিল, সেখানে চালানো ইসরায়েলি গুপ্তহত্যার চেষ্টা থেকে তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও নিহত হন তার ছেলে হুমাম ও বেশ কয়েকজন সহকারী। এর আগেও ২০১৪ সালের যুদ্ধে তার বড় ছেলে উসামা ও তার পরিবার, ২০০৮ সালে কাসাম ব্রিগেডের সদস্য ছেলে হামজা এবং সম্প্রতি তার আরেক ছেলে আজ্জাম ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারান।
দোহার ঘটনার পরপরই মিশরে অনুষ্ঠিত এক গোপনীয় কূটনৈতিক বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাথে আল-হাইয়ার এক মানবিক মুহূর্ত তৈরি হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ ছাড়পত্র নিয়ে বৈঠকে অংশ নেওয়া মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সামনে এই শোকের কথা উঠে আসে। নিজের এক সন্তানকে হারানো উইটকফ বৈঠকে আল-হাইয়াকে উদ্দেশ করে বলেন—সন্তান হারানোর এই বেদনা তাদের দুজনকেই একটি 'দুর্ভাগ্যজনক ক্লাবের সদস্য' বানিয়ে দিয়েছে। কুশনারের মতে, চরম সংঘাতপূর্ণ আলোচনার টেবিলে ওই মুহূর্তটি শত্রুতামূলক অবস্থান ছাপিয়ে দুটি মানুষের ব্যক্তিগত মানবিকতার ছোঁয়া এনে দিয়েছিল।
গাজা সিটিতে জন্ম নেওয়া এবং 'আবু উসামা' নামে পরিচিত আল-হাইয়া ইসলামী আইনশাস্ত্রে ডক্টরেট ডিগ্রির অধিকারী। ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে গঠিত হামাসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। ২০১১ সালে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে হামাস যখন ইরানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তখন সেই সম্পর্ক জোড়া লাগানোর ক্ষেত্রে প্রধান স্থপতি হিসেবে কাজ করেন আল-হাইয়া।
২০২২ সালে দামেস্কে গিয়ে আসাদের সঙ্গে বৈঠক এবং ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকে এটি স্পষ্ট যে, আল-হাইয়ার নেতৃত্বে হামাস আরও গভীরভাবে ইরানের নেতৃত্বাধীন 'প্রতিরোধ অক্ষে' যুক্ত থাকবে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ