আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চার মাস আগে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় নিহত হওয়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠান ঘিরে তেহরানে এখন স্মরণকালের সবচেয়ে বড় গণজমায়েতের প্রস্তুতি চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝেই এই বিশাল ও দীর্ঘ দাফন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার মিত্রদের একটি কঠোর ও প্রতিরোধী বার্তা দিতে চাইছে তেহরান। বিশেষ করে আজ ৪ জুলাই আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের ঠিক এই সময়েই ইরানজুড়ে সপ্তাহব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় দাফন প্রক্রিয়ার দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত মার্চেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং কঠোর নিরাপত্তার কারণে তা পিছিয়ে যায়। দীর্ঘ চার মাস ধরে ইসলামী শরিয়াহ মেনে অত্যন্ত আধুনিক রেফ্রিজারেটেড কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁর মরদেহ সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
শুক্রবার (৩ জুলাই) ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার মরদেহ তেহরানের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড মোসাল্লায় নিয়ে আসা হয় এবং এর মাধ্যমেই শুরু হয় সাত দিনব্যাপী দাফনের আনুষ্ঠানিকতা। ইতিমধ্যেই কালো পোশাক পরে লাখ লাখ মানুষ তেহরানের রাস্তায় নেমে এসেছেন। তাঁদের হাতে রয়েছে দেশের পতাকা এবং প্রয়াত নেতার ছবি। এদিকে খামেনির কফিনটি কারবালার ইমাম হোসেনের মাজার থেকে আনা একটি পবিত্র লাল পতাকা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, যাকে ইরানে ‘প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের প্রতীক’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পাকিস্তান, চীন, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল তেহরানে পৌঁছেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী शाहबाज শরিফ এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির আজই তেহরান সফর করে প্রয়াত নেতার কফিনে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন দেশের নেতা, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা পণ্ডিতেরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।
ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, "এই শাহাদাত আমাদের যাত্রার শেষ নয়, বরং এটি জাতীয় ঐক্য, প্রতিরোধ ও অগ্রগতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।" বিশ্লেষকদের মতে, দশকের পর দশক ধরে চলা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিধ্বংসী যুদ্ধের পরও এত জাঁকজমকপূর্ণ বিদায় ও দাফন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে দেখাতে চায় যে, তাদের शासनব্যবস্থা এখনো অক্ষত এবং শক্তিশালী।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের প্রথম দিন ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই সময় তিনি তেহরানে তাঁর আবাসিক ভবনে ছিলেন এবং হামলায় তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান। ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, যিনি দেশটিতে ইসলামি বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক নেতৃত্ব দিলেও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামোকে শক্তিশালীভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখেন।
এই শেষকৃত্য আরেকটি কারণেও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি হবে তাঁর উত্তরসূরি ও ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির অধীনে প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তবে যুদ্ধের প্রথম দিনের হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হন এবং এরপর থেকে গত চার মাস ধরে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। ৪ জুলাই থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত ইরান ও ইরাকের মোট পাঁচটি প্রধান শহরে এই শোকযাত্রা ও দাফন প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে।
৪ ও ৫ জুলাই তেহরানে সর্বসাধারণের জন্য জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। সাধারণ মানুষের বিদায় জানানোর সুবিধার্থে খামেনি এবং তাঁর পরিবারের নিহত সদস্যদের কফিন তেহরানের প্রধান ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় সমাবেশস্থল গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হবে। এরপর ৬ ও ৭ জুলাই খামেনির মরদেহ নিয়ে একটি শোকমিছিল তেহরানের বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করবে। পরে তা রাজধানী থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কোম শহরের উদ্দেশে যাত্রা করবে। কোম ইরানের শিয়া ইসলামি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এবং দেশটির অন্যতম পবিত্র শহর, যেখানে খামেনি নিজেও জীবনের একটি পর্যায়ে অধ্যয়ন করেছিলেন।
৮ জুলাই ইরাকের নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে খামেনির মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হবে। এরপর নাজাফ ও কারবালা শহরে জনসাধারণের শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। নাজাফে শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান হজরত আলী ইবনে আবি তালিবের (রা.) সমাধি এবং কারবালায় ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর সৎভাই আব্বাসের মাজার অবস্থিত। সবশেষে ৯ জুলাই খামেনির মরদেহ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। সেদিন মাশহাদের শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমাম রেজার মাজারে তাঁকে দাফন করা হবে। ১৯৩৯ সালে মাশহাদেই খামেনির জন্ম এবং শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এই মাজারের পাশে সমাহিত হওয়াকে সর্বোচ্চ সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখা হয়।