আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ বিদায় জানানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। জানাজা, শোকযাত্রা ও দাফনের প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হবে কয়েক ধাপে। ইরানের পাশাপাশি ইরাকেও বিভিন্ন সংস্কার পালন হবে।
শুক্রবার প্রথম দিনের কর্মসূচি মূলত আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিদের নিয়ে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, তেহরানে খামেনি ও তাঁর পরিবারের নিহত সদস্যদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন বিদেশি অতিথিরা। কফিন রাখা হয়েছে রাজধানীর গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে। এর বাইরে ভিড় করা সমর্থকদের আর্তনাদ করতে দেখা গেছে ছবিতে।
শনিবার সাধারণ মানুষ আলী খামেনিকে বিদায় জানাবেন। রোববার অনুষ্ঠিত হবে জানাজা ও দোয়া। সোমবার শোকযাত্রার পর মঙ্গলবার অনুসারীরা জড়ো হবেন শিয়াদের কাছে পবিত্র নগরী হিসেবে পরিচিত কোমে। বুধবার আলী খামেনির কফিন পাঠানো হবে ইরাকে। সেখানে নাজাফ ও কারবালায় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। বৃহস্পতিবার ইরানের মাশহাদে হবে দাফন পর্ব।
সাতদিনের এই কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, আয়োজনটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম জাতীয়, ধর্মীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। এই আয়োজনে জনসমাগমের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার প্রতি মানুষের আনুগত্যকেও তুলে ধরতে চাইবেন শাসকরা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন আলী খামেনি। কোম শহরের জুমার নামাজের খতিব আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ সাইদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন, শহীদ নেতা ও অন্যান্য শহীদদের জানাজার মিছিলে জনগণের বিশাল উপস্থিতিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পক্ষে আরেকটি গণভোট হিসেবে গণ্য করা হবে।
শাসকদের প্রতি সমর্থনের প্রতীক হতে যাওয়া সাতদিনের এই কর্মসূচি ঘিরে কর্তৃপক্ষ লাখ লাখ অনুসারীকে ইরানের শহরগুলোতে জড়ো করার পরিকল্পনা করছে। এজন্য সরকারিভাবে যাতায়াত, আবাসন ও খাবারের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে আলী খামেনির পর সর্বোচ্চ নেতা হওয়া তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির প্রকাশ্যে আসার ব্যাপারে এখনও কিছু জানা যায়নি। যুদ্ধ শুরু এবং সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তিনি অন্তরালে আছেন। বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাঁর বক্তব্য পড়ে শুনিয়েছেন উপস্থাপকরা।
এদিকে নাম প্রকাশ না করা বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে রয়টার্স লিখেছে, শোক কর্মসূচিতে ঐক্য ও আনুগত্যের বাহ্যিক আবরণের আড়ালে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের সমর্থন একেবারে তলানিতে ঠেকেছে।
দশকের পর দশক ধরে চলা নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় পঙ্গু হয়ে পড়া অর্থনীতির কারণে বহু ইরানি নাগরিক এখন ক্লান্ত। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতির কারণে সৃষ্ট বিক্ষোভে যখন মানুষ রাজপথে নেমেছিল, তখন অনেকেই আলী খামেনির মৃত্যু চেয়ে স্লোগান দিয়েছিলেন। এছাড়া, যুদ্ধ শুরুর পর খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তেহরানের অনেক বাসিন্দা উল্লাস প্রকাশ করেন।
রয়টার্স লিখেছে, বর্তমানে তেহরানের পরিস্থিতি বেশ থমথমে ও শান্ত। দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা ও ইসলামি বিপ্লবের জনক আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিকে শেষ বিদায় জানানোর সময় যেমন আবেগঘন পরিবেশ দেখা গিয়েছিল, আলী খামেনির বেলায় তা অনেকটাই কম।
রুহুল্লাহ খোমেনিকে বিদায় জানাতে লাখ লাখ শোকাতুর মানুষ ভিড় করেছিলেন। ভিড়ের চাপে কেউ কেউ কফিন বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের ওপরও চড়ে বসেন। উত্তেজিত জনতাকে সামলাতে আইআরজিসির সদস্যরা যখন হিমশিম খাচ্ছিলেন, তখন কফিনের একাংশ ভেঙে প্রয়াত নেতার পা বাইরে বেরিয়েছিল।
তেহরানের এক রেস্তোরাঁ মালিকের স্ত্রী সামিরা (৩৫) জানান, তাঁর পরিবার আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেবে না। এক সপ্তাহের জন্য তাঁরা রাজধানী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। আইআরজিসির স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর দিকে ইঙ্গিত করে সামিরা বলেন, ‘চারপাশে শুধু বাসিজদের আনাগোনা। মনে হচ্ছে পুরো জীবনটাই থমকে গেছে।’
প্রদর্শিত হয়েছে ৫ কফিন, খামেনি ছাড়া রয়েছে যাদের মরদেহ
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় পাঁচটি কফিন প্রদর্শন করা হয়েছে। নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের মরদেহ ইমাম খোমেইনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আনার পর সেখানে সাধারণ মানুষ ঢল নামিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই কফিনগুলোর মধ্যে রয়েছে আলি খামেনির জামাতা মেসবাহ-উল-হুদা বাঘেরি, বড় মেয়ে সাইয়্যেদেহ বোশরা হোসেইনি খামেনি, পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং মাত্র চৌদ্দ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়গানির মরদেহ।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, শিশু জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়গানির একটি ছবি একটি ছোট শিশুর কফিনের সামনে প্রদর্শন করা হয়। সব কফিনেই ইরানের জাতীয় পতাকা আঁকা ছিল।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা ইরিব জানিয়েছে, আফগানিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার ধর্মীয় ব্যক্তিরা প্রথম দিকের দর্শনার্থীদের মধ্যে ছিলেন, যারা গ্র্যান্ড মোসাল্লায় গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, আলি খামেনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের শুরুর দিকে নিহত হন।
খামেনির শেষ বিদায়ে থাকবেন ১০০ দেশের প্রতিনিধি
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় ও জানাজায় বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, পার্লামেন্টের স্পিকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিভিন্ন সরকারের বিশেষ প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই।
ইসমাইল বাঘেই বলেন, শহীদ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিদায় ও দাফন অনুষ্ঠান ইরানি জাতি, মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ এবং বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও মর্যাদাপূর্ণ ঘটনা।
তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ইরানে আসছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৮টায় আনুষ্ঠানিক বিদায় অনুষ্ঠান শুরু হবে এবং দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলবে। এতে বিপুলসংখ্যক বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ অংশ নেবেন।
এ ছাড়া শুক্রবার দুপুর দেড়টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের অংশগ্রহণে বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা অনুষ্ঠিত হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের যৌথ হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। মৃত্যুর চার মাস পর তার জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। দেশটির ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন।
ছয় দিনব্যাপী এই জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান প্রতিবেশী দেশ ইরাকসহ পাঁচটি শহরে অনুষ্ঠিত হবে। শনিবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রার্থনা চত্বরে খামেনির জানাজার মাধ্যমে এই অনুষ্ঠান শুরু হবে। সোমবার তেহরানের রাস্তায় একটি মিছিল শুরু হবে। মিছিলটি ৭ জুলাই পবিত্র শহর কোমে এবং তারপর ইরাকের নজফ ও কারবালা শহরের দিকে যাবে।
আগামী ৯ জুলাই খামেনির মরদেহ তার নিজ শহর মাশহাদে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে। ইরান এবং ইরানের বাইরে থেকে বহু মানুষ এই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
৪ মাস কীভাবে সংরক্ষণ করা হলো খামেনির মরদেহ
খামেনির মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর ৯ জুলাই তার দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান। দীর্ঘ এ সময় খামেনির মরদেহ কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জর্জ ওয়াশিংটন প্রোগ্রামের চরমপন্থা বিষয়ক ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ ওমর ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, মরদেহ রাসায়নিকভাবে সংরক্ষণ নয়, বরং শীতলীকরণ ব্যবস্থায় রাখা হয়েছে বলেই প্রায় নিশ্চিত। ইসলামে রাসায়নিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ নিষিদ্ধ।
ভিন্ন পরিস্থিতিতে শিয়া আইনে দাফন বিলম্বিত করা ও শীতলীকরণের মাধ্যমে মরদেহ সংরক্ষণের অনুমতি রয়েছে।
তার মতে, অক্ষত মরদেহ থাকলে বিদায় অনুষ্ঠান বাতিল, দাফনের স্থান বারবার পরিবর্তন বা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দাফনের সময় নিশ্চিত না করার প্রয়োজন পড়ত না। এটি মরদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব হলেও তা প্রদর্শনের উপযোগী না থাকার বড় ইঙ্গিত দেয়।
খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগমের আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
কর্মকর্তাদের ধারণা, শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে এক কোটি ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে।
এদিকে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে যে কোনো ধরনের হামলা থেকে বিরত থাকার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
উল্লেখ্য, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অংশ হিসেবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে নিজ বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন খামেনি। তিনি দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।