আল-জাজিরা
ছবি: আর জাজিরা
গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এবার নতুন বিপর্যয় হয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র প্রাকৃতিক দাবদাহ। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ, বিদ্যুৎহীনতা এবং পানির চরম সংকটের কারণে গাজা উপত্যকার লাখ লাখ বাস্তুচ্যুত পরিবার এখন ইতিহাসের অন্যতম কঠিন মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে।
মধ্য গাজা উপত্যকার দেইর আল-বালাহ অঞ্চলের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে এক নরককুণ্ডের দৃশ্য। প্লাস্টিক ও ক্যানভাস দিয়ে তৈরি অস্থায়ী তাঁবুগুলো এখন একেকটি জ্বলন্ত চুল্লিতে পরিণত হয়েছে। এই প্লাস্টিক ও ক্যানভাস দিনের বেলার তীব্র সূর্যতাপ ভেতরে আটকে রাখছে, যার ফলে দুপুরের দিকে তাঁবুর ভেতরে অবস্থান করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোগী ও আহতদের দ্বিগুণ দুর্ভোগ
অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব জরাজীর্ণ শিবিরের দমবন্ধ করা পরিবেশের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন যুদ্ধাহত ও গুরুতর অসুস্থ মানুষরা। আল জাজিরার সংবাদদাতা আশরাফ আবু আমরার তৈরি করা একটি ভিডিও প্রতিবেদনে গাজার এই নির্মম বাস্তবতার ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে।
সেখানে শ্বাসপ্রশ্বাস সচল রাখতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল এক রোগী তাঁর দৈনন্দিন যন্ত্রণার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, "এই প্রচণ্ড গরমে তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে মনে হয় দিনে অন্তত ৩০ বার আমার মৃত্যু হচ্ছে।" ন্যূনতম বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাও নেই এমন একটি প্লাস্টিকের তাঁবুর ভেতরে ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত বা যুদ্ধাহতদের ক্লান্ত ও দুর্বল শরীর এই তীব্র উষ্ণতা সহ্য করতে পারছে না। বিশেষ করে গ্রীষ্মের এই অসহ্য তাপে শিশুদের কোমল শরীর আরও বেশি নিস্তেজ হয়ে পড়ছে।
মায়েদের আপ্রাণ লড়াই ও শিশুদের হাহাকার
এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখতে অবিরাম লড়াই করে যাচ্ছেন বাস্তুচ্যুত মায়েরা। আত্মীয়-স্বজনদের সহযোগিতায় অনেক কষ্টে জোগাড় করা সামান্য পানি দিয়ে তারা সন্তানদের শরীর ঠান্ডা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।
শিবিরে আশ্রয় নেওয়া এক ফিলিস্তিনি নারী ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "সকাল সাতটা বাজলেই তাঁবুটি যেন দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করে, যা চলে বিকেল পর্যন্ত। এই অসহ্য গরম থেকে রেহাই দিতে আমি ছোট বাচ্চাদের মাথায় একটু পর পর পানি ঢালতে বাধ্য হচ্ছি।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা প্রাপ্তবয়স্করা হয়তো কোনো রকমে এই সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে নিতে পারি, কিন্তু এই অবুঝ শিশুদের তো সহ্য করার ক্ষমতা বা ধৈর্য নেই।"
শেষ আশ্রয় এখন সমুদ্র সৈকত
তাঁবুর ভেতরের অসহ্য দমবন্ধ করা গরম এবং তীব্র মশার কামড় ও পোকামাকড়ের হুল থেকে বাঁচতে দেইর আল-বালাহ সৈকত এখন স্থানীয় মানুষের কাছে একমাত্র ও শেষ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় যেকোনো মুহূর্তে হামলার নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত পুরুষ, নারী ও শিশু ছুটে যাচ্ছে সমুদ্রের দিকে। একটু শীতল বাতাস আর কয়েক ঘণ্টার বিশ্রামের সন্ধানে তারা সমুদ্রের নোনা জলে গা ভাসাচ্ছে। একদিকে যুদ্ধের বিভীষিকা, অন্যদিকে প্রকৃতির রুদ্ররূপ—সব মিলিয়ে ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের বুকে শীতলতা খোঁজার এই দৃশ্যটি গাজার মানুষের জীবন আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার এক অনন্য ও দৃঢ় সংকল্পকে মূর্ত করে তোলে।