ধ্রুব ডেস্ক
‘চাঁদরাত ছিল আতঙ্কের, ঈদের দিনও সবাই দ্রুত বাসায় চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বড় কিছু হতে পারে, ভয় কাজ করছে’।
‘আমরা শান্তিতে ছিলাম। এখন মনে হচ্ছে যে কোনো সময় বড় বিপদ হতে পারে। ঈদের দিনেও সবাই আল্লাহর কাছে দোয়া করছি যেন যুদ্ধ থেমে যায়’।
কথাগুলো বলছিলেন বাহরাইন প্রবাসী নুরুল আমিন; সাইরেনের শব্দ, হামলার আতঙ্ক আর সোশাল মিডিয়ার গুজবের মধ্যে চাঁদরাতেও ঘুম হয়নি তার।
নুরুল আমিনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনে ক্লিনিং সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেন।
তার মত বাহরাইন প্রবাসী দেড় লাখ বাংলাদেশির সবাই কমবেশি আতঙ্কে আছেন। শুক্রবার ঈদের দিনও তাদের কাটছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায়।
সিলেটের আব্দুল মালেক বাহরাইনে গাড়ি চালকের চাকরি করেন। অন্য সবার মত শুক্রবার সকালে তিনিও বৃষ্টির মধ্যে ঈদের নামজ পড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও আতঙ্ক পিছু ছাড়েনি।
মালেক বলেন, “আগেও উত্তেজনা দেখেছি, কিন্তু এবার পরিস্থিতি অন্যরকম। চাঁদরাত ছিল আতঙ্কের, ঈদের দিনও সবাই দ্রুত বাসায় চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বড় কিছু হতে পারে, ভয় কাজ করছে।”
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ গড়িয়েছে ২১তম দিনে। মার্কিন সামরিক উপস্থিতির থাকায় আমিরাতের মত উপসাগরীয় দেশগুলোকেও এ যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছে ইরান।
বাহরাইন সরাসরি যুদ্ধের ময়দান না হলেও চারপাশের অস্থিরতা, আকাশপথের অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে শান্তি নেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনে।
অনেকের কর্মস্থল সাময়িকভাবে বন্ধ, কারো কাজ কমে গেছে। ফলে ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
ঈদের দিনেও উৎসবের সেই আমেজ নেই তাদের জীবনে। স্বজনদের থেকে দূরে, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই তাদের দিন কাটছে।
শুক্রবার সকালে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে বাহরাইনে। তার মধ্যেই মানুষ মসজিদে গেছে ঈদের নামাজ পড়তে।
ঈদের প্রধান জামাত ছিল স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ১০ মিনিটে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে সেই জামাতে অংশ নেন। নামাজ শেষে শান্তি, সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় মোনাজাত করা হয়।
বাহরাইনের নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করা মো. জাহিদুল ইসলামের বাড়ি কুমিল্লায়। ঈদের দিন নিজের দুশ্চিন্তার কথা বলছিলেন।
‘আমরা তো যুদ্ধ চাই না, কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে কাজ বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকদিন ধরে। হাতে টাকা কমে যাচ্ছে, দেশে পরিবার নিয়ে চিন্তায় আছি। ঈদের দিনেও কোনো আনন্দ নেই’।
নরসিংদীর মো. রাকিব হোসেন প্রবাসী জীবনে একটি সুপারশপে সেলসম্যানের কাজ করেন। তিনিও বললেন অনিশ্চয়তার কথা।
“রাত হলেই ভয় লাগে। পরিবার ফোন করে কাঁদে, বলে দেশে ফিরে যেতে। কিন্তু এখন ফ্লাইটও ঠিকমতো নেই। ঈদের দিনেও মনে হচ্ছে আমরা বন্দি হয়ে আছি।”
চট্টগ্রামের শাহীন আলম কাজ করেন মানামার একটি রেস্তোরাঁয়। সেখানেও পড়েছে যুদ্ধের ছায়া।
“আমাদের রেস্তোরাঁয় কাস্টমার কমে গেছে। রমজান আর ঈদের দিনেও ব্যবসা নেই। মালিকও দুশ্চিন্তায়—কীভাবে বিল, ভাড়া দেবে, কেউ জানে না।”
মাদারীপুরের মো. সোহেল রানা পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান। যুদ্ধের কারণে দোটানার মধ্যে পড়ে গেছেন তিনি।
“প্রতিদিন খবর দেখি, ভয় পাই। পরিবার বলছে ফিরে আসতে, কিন্তু এত বছর পর সব ছেড়ে যাওয়া কঠিন। ঈদের দিনও নিশ্চিন্ত থাকার উপায় নেই।”
মাজহারুল ইসলাম বাবু বাহরাইনে বাংলাদেশ কমিউনিটির নেতা হিসেবে পরিচিত। তিনি প্রবাসে আছেন ১৭ বছর ধরে।
তিনি বললেন, “আসলে কী হতে যাচ্ছে বা কী হবে তা নিয়ে কারও সঠিক ধারণা নেই। আমাদের সকলের দিন কাটছে এক ধরনের ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে।
“তবে বাহরাইন সরকারকে ধন্যবাদ, তারা স্থানীয় নাগরিকদের পাশাপাশি প্রবাসীদেরও সমানভাবে সাপোর্ট দিচ্ছে। পর্যাপ্ত শেল্টারের ব্যবস্থা আছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা এখন পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে।”
গুজবে কান না দিয়ে সবাইকে ধৈর্য ধরে থাকতে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুসরণ করতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বাহরাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ রইস হাসান সরোয়ার ঈদের দিন প্রবাসী বাংলাদেশিদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দূতাবাস সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। প্রবাসীদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে দূতাবাসের হটলাইন খোলা রয়েছে।” বিডি নিউজ ২৪ সূত্রে এসব খবর জানাযায়।
ধ্রুব/এস.আই