Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

রাজরোগ গেঁটেবাত ফিরে আসছে তরুণদের মধ্যে

ধ্রুব ডেস্ক ধ্রুব ডেস্ক
প্রকাশ : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ০৭:১১ এ এম
আপডেট : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১১:১৬ এ এম
রাজরোগ গেঁটেবাত ফিরে আসছে তরুণদের মধ্যে

একসময় ‘রাজাদের রোগ’ হিসেবে পরিচিত গাউট বা গেঁটেবাত এখন আধুনিক যুগে আবারও ব্যাপকভাবে ফিরে আসছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রদাহজনিত আর্থ্রাইটিসের সবচেয়ে সাধারণ ধরণ হলো গেঁটেবাত। আর এই রোগের প্রকোপ ক্রমেই বাড়ছে, এমনকি তরুণদের মধ্যেও।

গেঁটেবাত হয় শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে বিভিন্ন ইউরেট যৌগের স্ফটিক জমে গেলে। এর ফলে তীব্র ব্যথা ও প্রদাহ দেখা দেয়। এই রোগ শরীরের প্রায় যেকোনো অংশে প্রভাব ফেলতে পারে, চোখ থেকে শুরু করে কিডনি ও হৃদ্যন্ত্র পর্যন্ত। এমনকি পুরুষের যৌনাঙ্গও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সম্প্রতি গবেষকেরা গেঁটেবাতের সঙ্গে প্রায়ই দেখা দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার দিকে নজর দিতে শুরু করেছেন, আর সেটি হলো ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা যৌন সক্ষমতা কমে যাওয়া।

কেন এই দুটি সমস্যা একই সঙ্গে দেখা দেয়, তার কারণও বিজ্ঞানীরা কেবল এখন ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছেন।

গেঁটেবাত রোগীদের মধ্যে যৌন অক্ষমতার ঝুঁকি বেশি
গত প্রায় এক দশকের গবেষণায় পাওয়া তথ্য বলছে, সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় গেঁটেবাতে আক্রান্ত পুরুষদের ইরেকটাইল ডিসফাংশনের ঝুঁকি অনেক বেশি। কিছু ছোট পরিসরের গবেষণায় এমনও দেখা গেছে, গেঁটেবাতে আক্রান্ত পুরুষদের সংখ্যাগরিষ্ঠেরই ইরেকটাইল ডিসফাংশন রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাটি গুরুতর।

এ কারণে কিছু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এখন পরামর্শ দিচ্ছেন, গেঁটেবাতে আক্রান্ত সব রোগীরই ইরেকটাইল ডিসফাংশন আছে কি না, তা পরীক্ষা বা মূল্যায়ন করা উচিত। এর প্রভাব শুধু একজন মানুষের যৌনজীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, গেঁটেবাতে আক্রান্ত যেসব রোগীর ইরেকটাইল ডিসফাংশন রয়েছে, তাদের হৃদ্যন্ত্রের বিভিন্ন রোগ এবং কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকা করোনারি আর্টারি ডিজিজের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

১৯৯০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষদের মধ্যে গেঁটেবাতের প্রকোপ ৯০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ২০১৪ সালে একটি জরিপ পরিচালনার পর রিউমাটোলজিস্ট নাওমি শ্লেসিঙ্গার বলেন, ‘পুরুষেরা সাধারণত যৌন সমস্যা নিয়ে নিজেরা থেকে কথা বলেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় অংশ নেওয়া গেঁটেবাত রোগীরা সাধারণত খুব খুশি এবং কৃতজ্ঞ ছিলেন যে শেষ পর্যন্ত কেউ তাদের ইরেকটাইল ডিসফাংশন নিয়ে প্রশ্ন করেছেন।’

তাহলে গেঁটেবাত ও ইরেকটাইল ডিসফাংশনের এই সম্পর্ক কি নিছক কাকতালীয়? নাকি গভীরে গিয়ে দেখলে এই দুটি স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে সত্যিই কোনো যোগসূত্র রয়েছে? বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন একটি যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা গেঁটেবাত ও ইরেকটাইল ডিসফাংশনকে একই সেতুর ওপর এনে দাঁড় করিয়েছে।

ইউরিক অ্যাসিডই কি মূল যোগসূত্র?
২০২১ সালে প্রকাশিত নয়টি গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গেঁটেবাত ও ইরেকটাইল ডিসফাংশনে আক্রান্ত রোগীদের রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা প্রায়ই অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে। গবেষণাটির লেখকেরা ধারণা করেন, ইউরেটের মাত্রা কমানোর চিকিৎসার মাধ্যমে ইরেকটাইল ডিসফাংশনও সম্ভবত চিকিৎসা করা যেতে পারে।

২০২৫ সালে একটি গবেষণা সেই ধারণাকে আরও এগিয়ে নেয়। গবেষকেরা ২৪ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মানুষের ক্লিনিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এতে দেখা যায়, রক্তে সিরাম ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা প্রতি ১০০ মাইক্রোমোল/লিটার বাড়লে ইরেকটাইল ডিসফাংশনের সম্ভাবনা ২ দশমিক ৫ গুণেরও বেশি বেড়ে যায়।

এরপর গবেষক দল ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালায়। তারা দেখতে পান, রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেশি হলে ইঁদুরের যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক উত্থান ক্ষমতা বা ইরেকটাইল ফাংশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি ইঁদুরগুলোর অন্য কোনো বিপাকীয় সমস্যা না থাকলেও একই ঘটনা ঘটে। গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেন, ইউরিক অ্যাসিড সম্ভবত পুরুষের যৌনাঙ্গের দণ্ড বা শ্যাফটের ইরেকটাইল টিস্যুর ভেতরে প্রবেশ করে সেটিকে সংকুচিত করে ফেলে। তাই ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা কমানোর চিকিৎসা ইরেকটাইল ফাংশন পুনরুদ্ধারে সম্ভাব্য ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে মানুষের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর কি না, তা এখনো পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয়নি।

গেঁটেবাতের চিকিৎসাও অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশে প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় গেঁটেবাতে আক্রান্ত মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষকে ইউরেটের মাত্রা কমানোর চিকিৎসা দেওয়া হয়। যুক্তরাজ্যের রিউমাটোলজিস্টদের করা এক জাতীয় নিরীক্ষায় দেখা গেছে, নতুন করে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেওয়ার এক বছর পর মাত্র ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ রোগী রক্তে সিরাম ইউরেটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পেরেছেন।

এর পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। চিকিৎসকেরা হয়তো সবসময় এই চিকিৎসা দিচ্ছেন না, অথবা রোগীরাই ওষুধ গ্রহণ করতে চাইছেন না। রক্তে ইউরেটের মাত্রা কমানো একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। রোগীদের বারবার পরীক্ষা করতে হয়, যাতে সময়ের সঙ্গে ওষুধের মাত্রা প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয় করা যায়। তবে ওষুধ কাজ শুরু করলে শরীরে জমে থাকা ইউরেটের স্ফটিক ধীরে ধীরে গলে যেতে পারে এবং গেঁটেবাতের আকস্মিক আক্রমণ বা ফ্লেয়ার-আপ কমে যেতে পারে।

এমনকি একসময় রোগটি রেমিশন বা দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণের অবস্থায়ও যেতে পারে। তবে এর জন্য আজীবন ওষুধ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন। আর কিছু রোগী সেই দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকেন না। অন্যদিকে গেঁটেবাতের চিকিৎসা না করেও ফেলে রাখা গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে পারে।

পুরুষাঙ্গেও জমতে পারে গেঁটেবাতের স্ফটিক
এ ধরনের ঘটনা বিরল এবং এ নিয়ে কেস স্টাডিও খুব কম। তবে কিছু প্রমাণ রয়েছে যে দীর্ঘদিন চিকিৎসাহীন গেঁটেবাতের কারণে পুরুষাঙ্গের ভেতরেও ইউরেটের স্ফটিক জমে যেতে পারে। এর ফলে কখনো কখনো বেদনাদায়ক উত্থান হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পর্যন্ত তৈরি করতে পারে। এমনই একটি কেস স্টাডিতে যে রোগীর কথা বলা হয়েছিল, তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৪ বছর।

বর্তমানে গেঁটেবাতকে অনেক সময় বয়স্ক মানুষ বা অতিরিক্ত ভোজনকারীদের রোগ হিসেবে দেখা হয়। ফলে এটিকে আধুনিক যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এর ফল হলো, অনেক রোগীই বুঝতে পারেন না গেঁটেবাত আসলে কী এবং এর সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা কীভাবে করা উচিত।

কিছু জরিপে দেখা গেছে, গেঁটেবাতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের রোগের আক্রমণ বা ফ্লেয়ার-আপ নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে দ্বিধা করেন। এমনকি যখন সেই সমস্যা তাদের দৈনন্দিন কাজ, যেমন হাঁটার ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে, তখনও তারা বিষয়টি চিকিৎসককে জানান না। অনেক রোগী আরও জানান, এই রোগের কারণে তাদের আত্মসম্মান বা আত্মবিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং সঙ্গীর সঙ্গে তাদের সম্পর্কেও এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়।

২০১৯ সালের একটি জরিপের গবেষকেরা লিখেছিলেন, ‘গেঁটেবাতের গুরুতরতা এবং রোগী ও তাদের পরিবারের ওপর এর বোঝা সম্পর্কে রোগী ও সাধারণ মানুষ উভয়কেই শিক্ষিত করার জরুরি প্রয়োজন রয়েছে।’

শুধু বয়স্কদের রোগ নয়
গেঁটেবাত সম্পর্কে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো, এই রোগ শুধু বয়স্কদের হয়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী সব বয়সের মানুষের মধ্যেই গেঁটেবাতের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষণায় বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই-কে গেঁটেবাতের একটি প্রধান ঝুঁকির কারণ হিসেবে পাওয়া যায়। তবে অতিরিক্ত ওজন একাই গেঁটেবাতের প্রকোপ বাড়ার কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

অ্যালকোহল ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও গেঁটেবাতের সম্পর্ক রয়েছে। কিছু গবেষক মনে করেন, সামগ্রিকভাবে খারাপ বিপাকীয় স্বাস্থ্যই হয়তো গেঁটেবাতের ক্রমবর্ধমান প্রকোপের মূল কারণ। বিশেষ করে ৪০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে গেঁটেবাতের রোগ নির্ণয় যত বাড়ছে, এই প্রদাহজনিত রোগের সঙ্গে ইরেকটাইল ডিসফাংশনের সম্পর্কও তত বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। গেঁটেবাত শুধু জয়েন্টে কী করছে, সেটি দেখার সময় শেষ। এখন সময় এসেছে, এই রোগ শরীরের অন্য কোথায় এবং কীভাবে প্রভাব ফেলছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার।

তথ্যসূত্র: সায়েন্সঅ্যালার্ট

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)