শারমিন আক্তার শিউলি
শহীদ চারবালা করের মরদেহ নিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার মিছিল(ইনসেটে চারুবালা কর) ছবি: সংগৃহীত
১৯৭১ সালের ৩ মার্চ। বসন্তের সেই সকালটি যশোরের জন্য কেবল ক্যালেন্ডারের একটি পাতা ছিল না, ছিল এক পরাধীন জাতির শিকল ভাঙার প্রথম গর্জন। একদিকে ইদগাহ ময়দানে লক্ষ জনতার গগনবিদারি স্লোগান, অন্যদিকে পাক-হানাদারদের তপ্ত বুলেট—সব মিলিয়ে ৩ মার্চ দিনটিই ছিল যশোরের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত মাহেন্দ্রক্ষণ। এই দিনেই প্রথম শহিদ হন বীরমাতা চারুবালা কর, আর যশোরবাসী প্রথম আস্বাদ পায় মানচিত্র খচিত স্বাধীনতার লাল-সবুজের পতাকার।
সেদিন সকাল থেকেই সারা শহরের মানুষ ছোট ছোট মিছিল নিয়ে জড়ো হতে শুরু করে যশোর ঈদগাহ ময়দানে। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের ডাকে আয়োজিত এই বিশাল জনসমাবেশে মুক্তিকামী মানুষের ভিড়ে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। সমাবেশের প্রধান আকর্ষণ ছিল স্বাধীন বাংলার সেই ঐতিহাসিক পতাকা, যার লাল বৃত্তের মাঝে ছিল হলুদ মানচিত্র।
এই পতাকাটির তৈরির ইতিহাস ছিল রোমাঞ্চকর। পতাকাটির ডিজাইন করেছিলেন সৈয়দ মহব্বত আলী, অমল সোম ও মাহমুদ উল-হকসহ একদল বিপ্লবী তরুণ। আর গভীর মমতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি সেলাই করেছিলেন অমল সোমের স্ত্রী রেবারাণী সোম ও সালেহা বেগমসহ আরও কয়েকজন অকুতোভয় নারী। পতাকাটি তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন বেজপাড়া তালতলার মরহুম কাজী আব্দুস শুকুর। যদিও যশোরে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা ওড়ানো হয় ২৩ মার্চ, তবে ৩ মার্চের এই সমাবেশে প্রথমবার হাজার হাজার মানুষের সামনে সেই পতাকাটি উত্তোলন করে যশোরের মুক্তিকামী জনতাকে যুদ্ধের চূড়ান্ত বার্তা দেওয়া হয়।
সমাবেশ শেষে জনতার একটি অংশ মিছিল নিয়ে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভবনের দিকে অগ্রসর হয়। ভবনটি তখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছিল। ক্ষুব্ধ জনতা যখন ভবন লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে, তখন ছাদে অবস্থানরত সৈন্যরা কোনো প্রকার উস্কানি ছাড়াই এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। সেই সময় নিজের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে জনতার এই স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ দেখছিলেন বৃদ্ধা চারুবালা কর। পাকবাহিনীর একটি বুলেট তার বুক বিদীর্ণ করে দেয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
১৯৪২ সালে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে মেদিনীপুরের মাটিতে যেমন জীবন দিয়েছিলেন মাতঙ্গিনী হাজরা, ঠিক ২৯ বছর পর ১৯৭১ সালে যশোরের মাটিতে স্বাধীনতার প্রথম জীবন দেন চারুবালা কর। তার মৃত্যু সংবাদ দাবানলের মতো পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়লে শোকের চেয়ে ক্রোধ বড় হয়ে ওঠে। বুলেটবিদ্ধ চারুবালা করের মরদেহ কাঁধে নিয়ে শুরু হয় বিশাল শোকযাত্রা, যা কিছুক্ষণের মধ্যেই জঙ্গি মিছিলে রূপ নেয়।
মিছিলটি যখন উত্তাল স্লোগান দিতে দিতে শহর প্রদক্ষিণ করছিল, তখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী মশিউর রহমানের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। মিছিলটি সার্কিট হাউসের দিকে অগ্রসর হয়। সেখানে তখন পাকবাহিনীর ক্যাম্প ও সামরিক আদালত। উত্তেজিত জনতা সার্কিট হাউসে হামলার চেষ্টা করলে সেনাদের হাতে থাকা রাইফেল গর্জে ওঠার উপক্রম হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে মশিউর রহমান বুক টান করে রাইফেলের সামনে দাঁড়িয়ে যান এবং সেনাদের গুলি চালানো থেকে নিরস্ত করেন।
এরপর জনতার ঢেউ আছড়ে পড়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বা কালেক্টরেট ভবনে। এখানেই ঘটে সেই দুঃসাহসিক ঘটনা। তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল হাই ভবনের সামনের পুকুরে হাত-মুখ ধুয়ে এক অসম্ভব তেজে জ্বলে ওঠেন। চতুর্দিকে তখন পাক সেনাদের গুলির শব্দ। কিন্তু কোনো ভয় তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি লোহার মই বেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভবনের ছাদে উঠে পড়েন। সেখানে উড়তে থাকা পাকিস্তানের চাঁদ-তারা খচিত পতাকাটি টেনে হিঁচড়ে নামিয়ে ফেলেন এবং মুহূর্তেই তাতে আগুন ধরিয়ে দেন। এরপর নিজের পকেট থেকে বের করেন ভাঁজ করা স্বাধীন বাংলার পতাকা এবং সগৌরবে তা কালেক্টরেট ভবনের শীর্ষে উড়িয়ে দেন। একই সময়ে জজ কোর্ট ভবনেও ওড়ানো হয় বাঙালির বিজয়ের নিশান।
বিকেলে শহীদ চারুবালা করের মরদেহ যখন শ্মশানে নেওয়া হয়, তখন পুরো যশোর শহর যেন রাস্তায় নেমে এসেছিল। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের সেই দীর্ঘ মৌন মিছিল ছিল দখলদারদের প্রতি এক নীরব অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষের মরদেহের প্রতি এমন শেষ শ্রদ্ধা ও গণজাগরণ এর আগে দেখেনি যশোরবাসী ।
৩ মার্চের সেই রক্তক্ষয়ী দিনটিই ছিল যশোরের মানুষের জন্য যুদ্ধের প্রকৃত দীক্ষা। চারুবালা করের আত্মদান এবং আব্দুল হাইয়ের সাহসিকতা আজও যশোরের প্রতিটি ধূলিকণায় বীরত্বের অমর স্মারক হয়ে আছে। সেই দিনের রক্ত আর পতাকাই মূলত ঠিক করে দিয়েছিল, আপোষ নয়—যশোরের মানুষ কেবল স্বাধীনতার সূর্যকেই আলিঙ্গন করবে।
তথ্যসূত্র : মুক্তিযুদ্ধে যশোর: রুকুনুদ্দৌল্লাহ