নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: সংগৃহীত
“রঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও-গো এবার যাবার আগে–
তোমার আপন রাগে, তোমার গোপন রাগে,
তোমার তরুণ হাসির অরুণ রাগে,
অশ্রুজলের করুণ রাগে।”
রবীন্দ্রনাথের এই আকুল আহ্বানেই যেন আজ প্রকৃতি সাড়া দিয়েছে। বসন্তের মাতাল হাওয়ায় যখন প্রকৃতি নতুন সাজে সজ্জিত, তখনই এসেছে রঙের উৎসব—দোল পূর্ণিমা বা হোলি। আবিরের লাল, নীল, হলুদ আর সবুজ রঙে আজ একাকার হয়ে গেছে যশোরের অলিগলি । সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার এই উৎসব আজ এক রঙিন মানবিক ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে।
যশোরের আঙিনায় আবিরের ওড়াউড়ি
সকাল হতেই যশোর শহরের বেজপাড়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্দির এলাকায় ছিল আবিরের মায়াবী ওড়াউড়ি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পিচকিরি থেকে ছিটকে আসা রঙিন জল আর বড়দের গালে মেখে দেওয়া বন্ধুত্বের আবির—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব আনন্দধারা। শহরের বিভিন্ন মোড়ে তরুণ-তরুণীদের জটলা আর উচ্চস্বরে গাওয়া গানের কলি উৎসবের আমেজকে করেছে আরও প্রাণবন্ত।
যশোরের বিভিন্ন মন্দিরে ভোরেই শুরু হয় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। দোলতলায় রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহকে আবিরে স্নান করানো হয়। ভক্তরা ভক্তিভরে আবির নিবেদন করেন এবং বিশ্বশান্তি ও মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। প্রসাদ বিতরণ আর নামসংকীর্তনের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক আবহে কাটে সকালের সময়টুকু। প্রবীণদের মতে, এই আবির কেবল রঙ নয়, এটি মনের ভেতরের মলিনতা ধুয়ে ফেলার এক পবিত্র পরশ।
দেশজুড়ে রঙের জোয়ার
যশোরের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই রঙিন জোয়ার আছড়ে পড়েছে রাজধানীসহ সারা দেশে। ঢাকার শাঁখারীবাজারের সরু গলিগুলো আজ পরিণত হয়েছিল এক জীবন্ত রামধনুতে। পুরান ঢাকার বনেদি আমেজ আর উৎসবের উন্মাদনা মিলেমিশে একাকার। চট্টগ্রাম, সিলেট আর রাজশাহীতেও দোল উৎসব পালিত হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের এই অংশগ্রহণই প্রমাণ করে—উৎসবের আনন্দ কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়।
ইতিহাসের আয়নায় হোলি
হোলি উৎসব একটি প্রাচীন ঐতিহ্য যার সাংস্কৃতিক শেকড় অনেক গভীরে। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, এই উৎসব গুপ্ত যুগেরও আগে উদ্ভূত হয়েছিল। জৈমিনির 'পূর্ব মীমাংসা সূত্র' এবং 'কথক-গৃহ্য-সূত্র'-এর মতো প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও নারদ পুরাণ এবং ভবিষ্য পুরাণেও এই রঙের উৎসবের বিশদ বর্ণনা রয়েছে।
সপ্তম শতাব্দীতে রাজা হর্ষের অমর রচনা ‘রত্নাবলী’-তে ‘হলিকোৎসব’-এর কথা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি কবি কালিদাস এবং দণ্ডীর ‘দশকুমার চরিত’-এ এই উৎসবের বর্ণনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই রঙের খেলা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে।
সম্প্রীতি ও মিলনের বার্তা
দুপুর হতেই ভিড় বাড়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। মিষ্টিমুখ আর কুশল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে উৎসব পায় ভিন্ন মাত্রা। পড়ন্ত রোদে আবির মাখা ক্লান্ত মুখগুলোতে ছিল প্রাপ্তির তৃপ্তি। দোল বা হোলি কেবল রঙ ছড়ানোর দিন নয়; এটি ক্ষমা, মৈত্রী আর ভ্রাতৃত্বের এক মহান বার্তা বহন করে।
“তেমনি আমায় দোল দিয়ে যাও যাবার পথে আগিয়ে দিয়ে,
কাঁদন-বাঁধন ভাগিয়ে দিয়ে।”
সবুজ প্রকৃতি আর আবিরের রঙের খেলা শেষে এক নতুন প্রত্যয় নিয়ে বিদায় নেয় আজকের এই দিনটি—যেখানে বিভেদ নয়, থাকে কেবল ভালোবাসার চিরস্থায়ী রঙ। অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ শক্তির জয়ের এই আবাহন ছড়িয়ে পড়ুক সবার হৃদয়ে।