বিশেষ প্রতিবেদক
যশোরের একজন আদর্শ শিক্ষক আলী আজম টিটো, যিনি ব্রাদার দিটো হিসেবে অধিক পরিচিত। ছবি: সংগৃহীত
“শিক্ষক হলেন সেই মোমবাতি, যিনি নিজে পুড়ে অন্যকে আলোর পথ দেখান।”—প্রখ্যাত পারস্য কবি ও দার্শনিক শেখ সাদী (র.)-এর এই কালজয়ী উক্তিটি যুগের পর যুগ ধরে শিক্ষকদের মহতী ত্যাগ ও অবদানকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আজ ৫ অক্টোবর, ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও শিক্ষকতার অনন্য মর্যাদাকে সম্মান জানাতে এবং শিক্ষাবিদদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বর্ণাঢ্য আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
ইউনেস্কো ঘোষিত এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘শিক্ষকদের পাশে: পেশার সুরক্ষায় ৬০ বছর, মর্যাদা এগিয়ে নেওয়া এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়া’। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষা ও সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করা এবং যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা সুদৃঢ় করা।
জাতি গঠনে শিক্ষকদের অনন্য অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে দেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের ১০১ জন গুণী শিক্ষককে বিশেষ সম্মাননা দিচ্ছে সরকার। সম্মাননাপ্রাপ্ত প্রত্যেক শিক্ষককে নগদ ২ লাখ টাকা, সম্মাননাপত্র ও ক্রেস্ট প্রদান করা হচ্ছে।
আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুর ২টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সম্মানিত শিক্ষকদের হাতে সম্মাননা তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া এমপি এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহদী আমিন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
গুণী শিক্ষক নির্বাচনের লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পৃথক সার্চ কমিটি গঠন করেছিল। প্রতিটি ক্যাটাগরিতে সুপারিশকৃত প্যানেল থেকে জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে এ চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদন করে।
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের মূল অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের জেলা-উপজেলা এবং প্রতিটি স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে একযোগে পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস।
১৯৯৪ সাল থেকে ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। ১৯৬৬ সালের এই দিনে প্যারিসে ইউনেস্কো ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সম্মেলনে শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার, দায়িত্ব ও কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক সুপারিশমালা গৃহীত হয়। মূলত সেই আন্তর্জাতিক সনদকে স্মরণীয় করে রাখতেই বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়।
একটি জাতির সুদৃঢ় ভবিষ্যৎ গঠনের প্রথম ভিতটি স্থাপন করেন একজন শিক্ষক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং জীবন দর্শনের প্রথম পাঠ মানুষ তার শিক্ষকের কাছ থেকেই পেয়ে থাকে। প্রযুক্তির আধুনিক যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা ইন্টারনেটের অভাবনীয় অগ্রগতি সত্ত্বেও একজন আদর্শ শিক্ষকের মমত্ববোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক দিকনির্দেশনার কোনো বিকল্প নেই।
তবে কেবল এক দিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শিক্ষকদের প্রতি দায়বদ্ধতা শেষ হয় না। শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন শিক্ষকদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকের যোগ্য সম্মান, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং গবেষণাধর্মী শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। সমাজ বদলের এই কারিগরদের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।