আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
দেশের শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই মানুষের রোজকার খাদ্যাভ্যাসে এক নীরব কিন্তু সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। চায়ের কাপে চিনি না নেওয়া কিংবা সুপারশপ থেকে পণ্য কেনার আগে 'সুগার-ফ্রি' লেখা আছে কি না তা পরখ করা এখন অনেকেরই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন জাগতে পারে, হুট করে কেন কমছে চিনির ব্যবহার? জনস্বাস্থ্যবিদ, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে জানা যাচ্ছে, কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং শারীরিক বাস্তবতা, বাজারমূল্য এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্পের কৌশলী পরিবর্তনের যৌথ ফলেই বদলে যাচ্ছে বাঙালির মিষ্টিমুখের এই পুরোনো সমীকরণ।
বিশ্বের চিত্র যেখানে পুরোপুরি ভিন্ন, সেখানে বাংলাদেশে চিনির চাহিদা নিম্নমুখী হওয়াকে বৈশ্বিক বাজারে বেশ বড় একটি ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ বিপণন মৌসুম থেকে ২০২৫-২৬ মৌসুমের মধ্যবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী চিনির ব্যবহার যেখানে পৌনে ৩ শতাংশের মতো বেড়েছে, সেখানে বাংলাদেশে ব্যবহারের হার কমেছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। ব্যবহার কমার এই হারে বৈশ্বিক তালিকার শীর্ষেই রয়েছে বাংলাদেশ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চার বছর আগে দেশে বার্ষিক চিনির ভোগ ২৭ লাখ ৬৭ হাজার টন থাকলেও সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে তা কমে ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টনে নেমে এসেছে। এমনকি এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের আমদানিনির্ভর বাজারে চিনি আমদানির পরিমাণও প্রায় চার লাখ টন হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষ কেন চিনির ব্যবহার কমাচ্ছে—তার মূলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে ডায়াবেটিসের আগ্রাসী প্রবৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের ২০২৫ সালের তথ্য মতে, বাংলাদেশে এখন ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ, যা বৈশ্বিক তালিকায় সপ্তম। সুনির্দিষ্ট চিকিৎসায় চিনি বর্জনের প্রত্যক্ষ পরামর্শ তো আছেই, পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যের সহজলভ্যতায় সাধারণ মানুষের মাঝেও অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে পড়ছে।
দ্বিতীয়ত, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে চায়ের দোকানগুলোর চিত্র বদল। প্রথাগত দুধ-চায়ের জায়গা দখল করে নিচ্ছে রং-চা ও বিভিন্ন ভেষজ চা। এমনকি মিষ্টির দোকানে বা বাসাবাড়ির মিষ্টান্ন তৈরিতেও চিনি কমানোর প্রবণতা স্পষ্ট। অন্যদিকে বাজারে চিনির আকাশচুম্বী দামও সাধারণ মানুষকে ভোগ সীমিত করতে বাধ্য করেছে। ২০২২ সালের শেষদিকে চিনির খুচরা দাম প্রথমবারের মতো ১০০ টাকা ছাড়িয়ে একপর্যায়ে ১৫০ টাকায় পৌঁছায়। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের যুগে অপ্রয়োজনীয় ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যে বাড়তি খরচ ছাঁটাইয়ের প্রথম শিকার হয়েছে এই চিনি।
এই সুযোগে বাজারের আচরণও বদলে গেছে দ্রুতগতিতে। চিনি না খেয়ে কৃত্রিম মিষ্টিকারক বা 'সুক্রালোজ'-এর দিকে ঝুঁকছে বেকারি ও পানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে সুক্রালোজের আমদানি প্রায় ৩৭৭ শতাংশ বা পৌনে পাঁচ গুণ বেড়ে ১ লাখ ৮ হাজার কেজি ছাড়িয়েছে। যেহেতু চিনি অপেক্ষা সামান্য পরিমাণ সুক্রালোজেই বহু গুণ বেশি মিষ্টতা আসে, তাই কম চিনি বা চিনিমুক্ত বিস্কুট, জুস, কফি কিংবা ডেইরি পণ্য তৈরিতে প্রস্তুতকারকরা এটির দিকেই ঝুঁকছেন। প্রাণ-আরএফএল সহ বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো গ্রাহকের চাহিদা রক্ষায় এখন তাদের চিনিমুক্ত পণ্যের লাইন সম্প্রসারণে জোর দিচ্ছে।
ভোগের এমন পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়েছে দেশের চিনি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পেও। চাহিদা ও ব্যবসার পরিধি না বাড়ায় গত দুই দশকে তৈরি হওয়া রিফাইনারিগুলোর মধ্যে বর্তমানে কেবল বড় তিনটি কারখানা সক্রিয় রয়েছে এবং এতে নতুন করে কোনো বড় মূলধনি বিনিয়োগ আসছে না। গবেষকদের মতে, এটি কোনো সাময়িক ঘটনা নয়; স্বাস্থ্যসচেতনতা, বিকল্প উপাদানের সহজলভ্যতা এবং পণ্যের দাম মিলে সাধারণ মানুষের আহার সংস্কৃতিতে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এনেছে—এই পরিসংখ্যান তারই বড় প্রমাণ।