❒ যশোরে চাহিদার উদ্বৃত্ত কোরবানির পশু প্রায় ১৫ হাজার
এম জামান
যশোর সদরের একটি খামার থেকে তোলা। ছবি: ধ্রুব নিউজ
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে যশোরের খামারগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন গবাদিপশু পালনকারীরা। জেলার বিভিন্ন খামারে কোরবানিযোগ্য পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। একদিকে বাড়তি উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে বাজারে দালাল ও সিন্ডিকেটের প্রভাব। সব মিলিয়ে লাভ-লোকসানের হিসাব কষতে গিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে খামারিদের।
কোরবানি নিয়েএখন খামারে খামারে চলছে নিবিড় তদারকি ও বাড়তি পরিচর্যা। গরু সুস্থ ও আকর্ষণীয় রাখতে নিয়মিত দানাদার খাবার, ঘাস ও পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি খামার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন খামারিরা। যাতে কোরবানির আগে কোনো ধরনের রোগব্যাধি গবাদিপশুর মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য প্রতিনিয়ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন তারা।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অনেক খামারে পরিবারের সদস্যরাও গরুর পরিচর্যায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। কেউ গরুর খাবার দিচ্ছেন, কেউ গোসল করাচ্ছেন, আবার কেউ খামারের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গরুর যত্নে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। খামারজুড়ে যেন এখন সকল ব্যস্ততা বিরাজ করছে।
তবে এই ব্যস্ততার আড়ালেও রয়েছে খামারিদের দীর্ঘশ্বাস। গত বছরের কোরবানির হাটে লোকসান, শেষ মুহূর্তে কম দামে পশু বিক্রি, অবিক্রীত গরু বাড়ি ফিরিয়ে আনা এবং বাজারে দালাল ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের অভিজ্ঞতা এখনো ভুলতে পারেননি অনেক খামারি। এসব কারণে এবারও তারা শঙ্কিত—চাহিদার তুলনায় পশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
খামারিদের দাবি, প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি এবং দালালমুক্ত বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে তারা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পশু বিক্রি করতে পারবেন এবং ন্যায্যমূল্য পাবেন। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বিদেশি গরু প্রবেশ বন্ধ রাখার দাবিও জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, স্থানীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষা করা গেলে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত আরও শক্তিশালী হবে এবং হাজারো খামারি পরিবার অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।
যশোর জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, যশোর জেলায় ১৩ হাজার ৬৪০টি গবাদিপশুর খামারে মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৭৭টি পশু রয়েছে। এখানে গরুর সংখ্যা মোট ৩৬ হাজার ২৫৯টি। এর মধ্যে ষাঁড় রয়েছে ২৮ হাজার ৮৪৪টি, বলদ ৯৫৭টি এবং গাভী ৬ হাজার ৪৫৮টি। এদিকে ছাগল রয়েছে ৮১ হাজার ২৭৬টি এবং ভেড়া ৪৪২টি। যশোর জেলায় এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা ১ লাখ ৩ হাজার ১২৮টি। চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত ১৪ হাজার ৮৪৯টি গবাদিপশু লালন-পালন করছেন খামারিরা।
সদর উপজেলার কিসমত নওয়াপাড়ার সাইফুল ইসলাম জানান, “কোরবানিকে সামনে রেখে আমি ১২টি গরু লালন-পালন করেছি। এর মধ্যে দুটি গরু বিক্রি হয়ে গেছে। তবে এ বছর গরু নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি। কারণ সব জিনিসেরই দাম অনেক বেশি। একই সঙ্গে গরুর খাবারের দামও অনেক বেড়েছে। তাই আমি সরকারের কাছে আহ্বান জানাই, সরকার যেন আমাদের দিকে নজর রাখে। যদি ভারতীয় গরু আসে, তাহলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে। কারণ প্রতিটি গরুর পেছনে অনেক খরচ হয়। এদিকে বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা চাই সংকটকালীন সময়ে সরকার যেন আমাদের পাশে থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “বিগত সময়ে কয়েকবার গরু নিয়ে লোকসান হয়েছে। আমি বাজারে গরু বিক্রি করতে পারিনি। তাই আমি সরকারকে বলবো আমাদের জন্য স্বল্প মুনাফায় ঋণের ব্যবস্থা করতে।”
যশোর সদর উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের খাজুরা গ্রামের খামারি মেহেদী হাসান জানান, “আমি বর্তমানে ১০টি গরু মোটাতাজা করছি। তবে আশা করি আমার গরুতে লোকসান হবে না। কারণ আমার গরুগুলো সবই মাঝারি সাইজের। মাঝারি সাইজের গরুর চাহিদা অনেক বেশি থাকে। তবে ভারতীয় গরু ঢুকলে লোকসানের সম্ভাবনা বেশি।”
কেশবপুর উপজেলার দশকাউনিয়া গ্রামের খামারি কামরুল ইসলাম জানান, “কোরবানির আগে পশুখাদ্যের দাম বেড়ে যায়। এজন্য তাদের খাবার খরচও এ সময় বেশি হয়ে যায়। একটি গরু লালন-পালন করে যে খরচ হয়, সেই তুলনায় দাম পাওয়া যায় না। এদিকে বাজারের সিন্ডিকেট যদি প্রশাসন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তাহলেও আমরা ভালো দাম পাবো। কারণ অনেক সময় আমাদের থেকে দালালরাই বেশি লাভবান হয়ে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে গরুর খাবারের দাম বেশি হওয়ায় গ্রামের অনেকেই গরু লালন-পালন বন্ধ করে দিয়েছেন।”
এ বিষয়ে যশোর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “যশোর জেলা একটি প্রাণিসম্পদ সমৃদ্ধ জেলা। প্রাণিসম্পদ যশোর জেলার ঐতিহ্যের একটি অংশ। ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এ বছর যশোর জেলায় ১৩ হাজার ৬০০’র বেশি খামারি ১ লাখ ১৭ হাজারের বেশি গরু লালন-পালন করেছেন। এই গরু যশোর জেলার চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে সরবরাহ করা হবে।”
তিনি বলেন, “আমরা এসব খামারিকে বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গরু সুস্থ রাখার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। আমরা খামারগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করছি। আমার জানামতে, কোনো রাসায়নিক ছাড়াই যশোরে গরু মোটাতাজা করা হয়েছে। তাই আমি সবাইকে আহ্বান করবো, যারা এ বছর কোরবানি দেবেন তারা যেন যশোরের গরুকে প্রাধান্য দেন।”
খাদ্যের উচ্চমূল্যের বিষয়ে তিনি বলেন, “কিছু খামারি অভিযোগ করেছেন বর্তমানে খাবারের দাম অনেক বেশি। আমরা সেখানে পরামর্শ দিয়েছি, তারা যেন দানাদার খাবারের পাশাপাশি ঘাসের ব্যবহার বেশি করেন। এতে খরচ কমবে এবং লাভের পরিমাণও বাড়বে।”
ভারতীয় গরু প্রবেশের আশঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এ বছর আমরা খামারিদের বিশেষভাবে আশ্বস্ত করছি, সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের গরু আসার সম্ভাবনা নেই। আমরা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চাই, যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা সবাই লাভবান হতে পারেন।"
ধ্রুব/এস.আই