❒ জনপ্রিয় ফুটবলার থেকে অপরাধ জগতের শীর্ষ নাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
বুধবার রাতে বাড়িতে টিটনের মরদেহ পৌছানোর পর ছবি: ধ্রুব নিউজ
রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত দেশের এক সময়ের শীর্ষ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে তার নিজ শহর যশোরে সমাহিত করা হয়েছে। বুধবার রাত ৮টার দিকে ঢাকা থেকে তার মরদেহ শহরের কারবালা এলাকায় পৌঁছালে স্বজনদের কান্নায় এক শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়। রাতেই জানাজা শেষে কারবালা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
নিহত টিটন যশোর শহরের খড়কি আপনমোড় এলাকার বাসিন্দা ও জুটমিল কর্মকর্তা কে এম ফকরউদ্দিনের ছেলে। ১১ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অপরাধ জগতের সাথে যুক্ত থাকলেও তার জীবনের শুরুটা ছিল একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে।

খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন
জনপ্রিয় ফুটবলার থেকে অপরাধ জগতের শীর্ষ নাম
যশোরের ক্রীড়াঙ্গনের প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আশির দশকের শেষের দিকে টিটন ছিলেন মাঠ কাঁপানো এক জনপ্রিয় ফুটবলার। ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে যশোরের কিংবদন্তি ওস্তাদখ্যাত কোচ ইমদাদুল হক সাচ্চুর তত্ত্বাবধানে জেলায় যে কজন সেরা ফুটবলার প্রতিনিধিত্ব করতেন, টিটন তাদের মধ্যে অন্যতম। আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় হিসেবে নৈপুণ্য থাকায় চুয়াডাঙ্গা, খুলনা ও ঢাকাতেও বিভিন্ন দলের হয়ে নিয়মিত খেলতেন তিনি।
তবে খেলোয়াড় জীবনের জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকাকালেই তিনি রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯৮ সালের দিকে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রতিপক্ষের হামলায় তিনি মারাত্মকভাবে জখম হন। কয়েকমাস মৃত্যুর সাথে লড়াই করে সুস্থ হয়ে ফেরার পর তিনি চরম প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালায় চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের ঘটনার পর তিনি যশোর ছেড়ে ঢাকায় চলে যান এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজের আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই ‘২ নম্বর’ তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী
২০০১ সালে তৎকালীন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে পুরস্কার ঘোষণা করেছিল; সেই তালিকায় টিটনের নাম ছিল ২ নম্বরে। ঢাকার মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায় তার ত্রাস ও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমনের ভগ্নিপতি হওয়ার সুবাদে আন্ডারওয়ার্ল্ডে তার ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। তিনি কুখ্যাত হারিছ-জোসেফ গ্রুপেও যুক্ত ছিলেন।
টিটনের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ও অস্ত্র-সোনা চোরাচালানের অভিযোগ ছিল। যার মধ্যে অন্যতম ছিল ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা। ২০০৪ সালে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়। দীর্ঘ দুই দশক কারাভোগের পর গত ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে আত্মগোপনে ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে বসিলা হাটের ইজারা
টিটনের পরিবারের দাবি, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতেন এবং অতীতের ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ব্যবসা-বাণিজ্য করে সৎ পথে ফেরার ইচ্ছা জানিয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি বসিলা পশুর হাটের ইজারা সংক্রান্ত কাগজপত্র (শিডিউল) কেনেন। এই ইজারা নিয়েই পিচ্চি হেলাল, বাদল, শাহজাহান ও রনিদের সাথে তার চরম বিরোধ তৈরি হয়। গত ২৭ এপ্রিল ওই বিরোধ মেটানোর কথা বলে তাকে একটি মিটিংয়ে ডাকা হয়েছিল। এরপরই মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ হলের সামনে মোটরসাইকেলে আসা দুই মুখোশধারী সন্ত্রাসীর গুলিতে তার মৃত্যু হয়।
বর্তমান পরিস্থিতি ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
যশোরের সাবেক খেলোয়াড় ও রেফারি লাবু জোয়াদ্দার জানান, টিটন ও তার বড় ভাই রিপন দুজনেই যশোরের সেরা ফুটবলার ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত একটি রাজনৈতিক হামলা তাকে অন্ধকার জগতে ঠেলে দেয়। স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন যশোরে না থাকায় বর্তমান প্রজন্মের কাছে টিটন অচেনা হলেও বয়স্কদের কাছে তিনি এক ট্র্যাজেডির নাম।
এ ঘটনায় বুধবার সকালে নিহত টিটনের বড় ভাই খন্দকার সাঈদ আক্তার রিপন বাদী হয়ে নিউ মার্কেট থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ৮-৯ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। নিউ মার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আইয়ুব জানান, বসিলা পশুর হাটের ইজারা সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি মাথায় রেখে তদন্ত চলছে। এদিকে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান জানান, টিটনের বিরুদ্ধে আগের মামলা থাকলেও বর্তমানে যশোর পুলিশের কাছে নতুন কোনো আপডেট নেই।
দীর্ঘ কয়েক দশকের অপরাধ অধ্যায়ের পর অবশেষে নিজের শহর যশোর সেই গুলিতেই জীবনের সমাপ্তি ঘটলো এক সময়ের মাঠ কাঁপানো এই ফুটবলারের।
টিটন আমার বন্ধু-পিচ্চি হেলাল
এদিকে খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল। বুধবার রাতে তিনি বলেন, টিটনের সঙ্গে তার 'চমৎকার সম্পর্ক' ছিল এবং তাকে তিনি 'বন্ধু হিসেবে ভালোবাসতেন'।
হেলাল অভিযোগ করেন, স্থানীয় কিছু অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যম অপরাধচক্রের প্রভাবেই বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচার করছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে তার নাম সামনে আনা হচ্ছে। তার দাবি, তার কোনো 'কিশোর গ্যাং' বা সন্ত্রাসী বাহিনী নেই; বরং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে সহজেই তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।
টিটন হত্যার বিষয়ে হেলাল বলেন, নিহত টিটন অতীতে তার সঙ্গে টেলিভিশনে বক্তব্য দিয়েছেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, টিটন জীবিত অবস্থায় তাকে জানিয়েছিলেন যে প্রতিপক্ষ সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমন একাধিক মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করছে এবং হত্যার আশঙ্কার কথাও প্রকাশ করেছিলেন। হেলাল আরও দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ইমনের স্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত বলেও মনে করেন হেলাল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, টিটনের ওই এলাকায় যাওয়ার কথা ছিল না; তাকে 'টোপ দিয়ে' সেখানে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, 'মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও ডাটা ফরেনসিক বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে কে বা কারা তাকে সেখানে ডেকেছিল এবং কারা ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল।' প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও মিথ্যা প্রমাণিত হবে বলে জোর দিয়ে বলেন তিনি।
মামলার এজাহারের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন হেলাল। তার দাবি, একটি অনলাইন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকার 'পরিকল্পিত' এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে 'চাপ দিয়ে' কথা বলানো হয়েছে। এজাহার দায়েরের প্রক্রিয়া নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, নিহতের পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নির্দিষ্ট কিছু নাম যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'ঘটনার আগ পর্যন্ত যাদের নাম সামনে আসছিল, পরদিনই এজাহারে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়—এটা স্বাভাবিক নয়।' ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নিতে 'হার্ট সংক্রান্ত বিরোধের গল্প' দাঁড় করানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
প্রশাসনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন হেলাল। তার অভিযোগ, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও অপরাধ চললেও তা কার্যকরভাবে দমন করা হয়নি। তিনি বলেন, 'একটি ঘটনা ঘটলে কিছুদিন তৎপরতা দেখা যায়, পরে তা ধামাচাপা পড়ে যায়—এই সুযোগেই অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।' অতীতের কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের পেছনেও একই চক্র সক্রিয় থাকতে পারে বলে দাবি করেন তিনি।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে হেলাল বলেন, তিনি দেশে থেকেই সব অভিযোগের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে এভাবে প্রকাশ্যে কথা বলতেন না। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের মোবাইল ফরেনসিক পরীক্ষার দাবিও জানান তিনি। হেলাল বলেন, 'সত্য উদঘাটন না হলে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে এবং নির্দোষ মানুষ হয়রানির শিকার হবে।'