নিজস্ব প্রতিবেদক
এই মোটরসাইকেলে বহন করা হয় ইউনুসের মরদেহ ছবি: ধ্রুব নিউজ
মাঝরাতের নিস্তব্ধতা চিরে একটি মোটরসাইকেল দ্রুতগতিতে মিলিয়ে গেল বেনাপোল-পুটখালী সড়কের অন্ধকারে। পরদিন সকালে সড়কের ‘বটতলা’ নামক স্থানে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা নিথর দেহটি যখন উদ্ধার হলো, তখন কেউ জানত না এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে প্রেম, প্রতারণা আর প্রতিহিংসার এক নীল নকশা। বেনাপোল স্থলবন্দরের নিরাপত্তাকর্মী ইউনুস আলী (৪৭) হত্যাকাণ্ডের সেই রহস্যের জট অবশেষে খুলেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তদন্তে নেমে পিবিআই যশোর জেলা পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান দেখেন, এই খুনের শিকড় প্রোথিত ছিল দীর্ঘদিনের দাম্পত্য কলহ ও এক নিষিদ্ধ সম্পর্কের টানাপোড়েনে। ইউনুস আলীর সাথে তাসলীমা খাতুনের বিয়ে হয়েছিল ৩০ বছর আগে। কিন্তু ৫ বছর আগে তাসলীমা স্থানীয় আনোয়ার হোসেনের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে ইউনুসের সংসার ছেড়ে চলে যান এবং আনোয়ারকে বিয়ে করেন। কিছুদিন পর আনোয়ারের সংসার ছেড়ে ফের ইউনুসের কাছে ফিরে আসায় চরম ক্ষুব্ধ হন আনোয়ার। সেই আক্রোশ থেকেই ইউনুসকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি।
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ এপ্রিল ছিল ইউনুসের জীবনের শেষ দিন। স্ত্রী তাসলীমা তখন খুলনায় মেয়ের বাড়িতে। ইউনুস গাতিপাড়ার বাড়িতে তার বৃদ্ধা মায়ের সাথে ছিলেন। খুনিদের লক্ষ্য ছিল তাকে কৌশলে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে যাওয়া। সেই দায়িত্ব পড়ে ঘাতক তরিকুল ইসলামের (৪০) ওপর। দুপুরের দিকে কাজের কথা বলে ইউনুসকে ডেকে রহমতপুর গ্রামের জনৈক রানার বাড়িতে নিয়ে যায় তরিকুল। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন মূল পরিকল্পনাকারী আনোয়ার হোসেন ও রানা। ঘরের ভেতর নিয়ে ইউনুসের ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। প্রাণ ভিক্ষা চেয়েও মেলেনি রেহাই; একপর্যায়ে সবাই মিলে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
হত্যার পর নিথর দেহটি গুম করার জন্য বেছে নেওয়া হয় গভীর রাত। আটককৃত সহযোগী সবুজ হোসেনের (২১) অ্যাপাচি মোটরসাইকেলে লাশটি তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বেনাপোল-পুটখালী রোডে। জনশূন্য চারা বটতলা এলাকায় সড়কের পাশে লাশটি ফেলে দিয়ে ঘাতকরা পালিয়ে যায়। তারা ভেবেছিল অন্ধকারেই ঢাকা পড়বে সব চিহ্ন।
হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের ভাই ইউসুফ আলী পোর্ট থানায় অজ্ঞাতনামা মামলা করলে তদন্তভার পায় পিবিআই। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রতন মিয়া তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘাতকদের পিছু নেন। গত সোমবার রাত সোয়া ৯টার দিকে গোপালগঞ্জ থেকে তরিকুল ইসলামকে আটকের পর বেরিয়ে আসে খুনের বিস্তারিত তথ্য। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই রাত সাড়ে ৩টার দিকে রহমতপুরের নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয় সবুজ হোসেনকে। সবুজের স্বীকারোক্তিতে তার বাড়ি থেকেই জব্দ করা হয় মরদেহ বহনে ব্যবহৃত সেই মোটরসাইকেলটি।
রহস্য উদঘাটিত হলেও নাটকের যবনিকা পুরোপুরি পড়েনি। পিবিআই জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী আনোয়ার হোসেন ও বাড়ির মালিক রানা এখনো পলাতক।