ধ্রুব ডেস্ক
আদালতে প্রধান আসামী সোহেল রানা। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিশু ছাত্রী রামিসা আক্তারকে (৮) ধর্ষণের পর গলাকেটে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামীকাল মঙ্গলবার (২ জুন) দিন ধার্য করা হয়েছে।
আজ সোমবার (১ জুন) সকালে শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত এই আদেশ দেন। এর মাধ্যমে ঘটনার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় এবং তদন্ত শুরুর মাত্র ছয় দিনের মধ্যে মামলার প্রাথমিক তদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা, অভিযোগপত্র দাখিল ও তা আদালতে আমলে নেওয়ার প্রধান চারটি ধাপ শেষ হলো।
আজ সকালে চার্জ গঠনের শুনানির সময় এক নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়ে শোনানোর সময় প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘আমার স্ত্রীর কোনো দোষ নেই।’ এ সময় স্বপ্নাও সোহেল রানাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘বলো, বলো আমার কোনো দোষ ছিল?’ তবে আদালত তাদের এই কথা আমলে না নিয়ে চার্জ পড়ে শোনান। পরে আসামিদের কাছে তারা দোষী না নির্দোষ জানতে চাওয়া হলে, তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।
এর আগে আজ সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কড়া নিরাপত্তায় দুই আসামিকে কারাগার থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কাশিমপুর কারাগার থেকে নিয়ে আসা হয়। এরপর সকাল ১১টা ১০ মিনিটে তাদের এজলাসে তোলা হয়। আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকায় রাষ্ট্রীয় খরচে আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে ঢাকা বারের সদস্য অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহকে নিয়োগ দেয় আইন মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রপক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি করেন। এ সময় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর পিপি ওমর ফারুক ফারুকী উপস্থিত ছিলেন।
মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, "মামলাটি যেন দ্রুত শেষ হয়, সে বিষয়ে আমি আমার অর্পিত দায়িত্ব সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে পালন করব। বাকি সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনাল নেবেন।"
অন্যদিকে, মামলার রায় ও তা কার্যকর করার প্রক্রিয়া নিয়ে ঢাকার জেলা লিগ্যাল এইডের নিয়মিত আইনজীবী রায়হানা নাজনীন জুই জানান, রামিসার মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে। তবে নিম্ন আদালতে রায় হলেই তো হবে না, এটি কার্যকর করাটাই আসল চ্যালেঞ্জ; যা মূলত উচ্চ আদালতে গিয়ে থমকে যায়। নিম্ন আদালতের পর কারাগারের জেলার এবং প্রধান বিচারপতির বিশেষ হস্তক্ষেপ পেলে আশা করা যায় এটি দ্রুত শেষ হবে। না হলে ডেথ রেফারেন্স সংগ্রহসহ বিভিন্ন আইনি ধাপ শেষ করতে করতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে।
মামলার অভিযোগপত্র ও এজাহার সূত্রে জানা গেছে, নিহত রামিসা আক্তার পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে ঘর থেকে বের হলে আসামি স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তাদের ফ্ল্যাটের ভেতরে নিয়ে যান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করার একপর্যায়ে প্রতিবেশীরা ওই ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান। ডাকাডাকির পর কোনো সাড়া না পেয়ে রামিসার পরিবার ও প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং বাথরুমের বালতির ভেতর তার কাটা মাথা উদ্ধার করেন।
ঘটনাস্থল থেকে স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হলেও প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ২০ মে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। এরপর গত ২৪clickable মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ১৮ জনকে সাক্ষী করে আদালতে দ্রুততম সময়ে অভিযোগপত্র জমা দেন। তদন্তে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার এবং স্বপ্নার বিরুদ্ধে অপরাধে সহায়তার অভিযোগ প্রমাণিত হয়।