ফাহিম ফারহান
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর নিলেন লিওনেল মেসি ছবি: সংগৃহীত
লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সির রূপকথাতুল্য যে দীর্ঘ অধ্যায়, তার আনুষ্ঠানিক যবনিকাপাত ঘটল এক একবুক আবেগ ও অশ্রুসিক্ত বিদায়বার্তায়। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলোর মধ্য দিয়ে গিয়েও ২০ বছর ধরে যিনি কখনো হাল ছাড়েননি, সেই ফুটবল জাদুকর অবশেষে ঘোষণা করলেন আলবিসেলেস্তেদের হয়ে তার পথচলার সমাপ্তি। বিদায়বেলায় ভক্তদের উদ্দেশ্যে দেওয়া তার দীর্ঘ বক্তব্যের ভাষা ছিল যেমন আকুল, তেমনই ছিল জাতীয় দলের হয়ে এতদিনের পথচলার স্মৃতিতে ভারী।
জাতীয় দলের হয়ে নিজের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের ইতি টেনে আবেগাপ্লুত মেসি জানান, আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে জড়ানোর চেয়ে সুন্দর ও আনন্দের অভিজ্ঞতা ফুটবল জীবনে আর কিছুই হতে পারে না। যদি সম্ভব হতো, তবে তিনি সারাজীবনই এই জার্সিতে খেলে যেতে চাইতেন। তবে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তিনি মানেন যে, সরে দাঁড়ানোর সঠিক সময় এখনই। বহু রক্ত-ঘাম ঝরানো স্মৃতি ও টানা লড়াইয়ের পর অবসরের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে মেসি স্বীকার করেন, হয়তো জীবনের অন্যতম কষ্টের একটা দিন এটি। বিদায়ের মুহূর্তটিকে দীর্ঘ করতে এবং স্মৃতির পাতায় ধরে রাখতে স্বাভাবিকের চেয়ে যেন একটু বেশিই কথা বলছিলেন তিনি, কারণ এই স্বপ্নীল মুহূর্তটা যেন শেষই হতে দিতে চাইছিলেন না এই মহাতারকা।
নিজের জাতীয় দল ক্যারিয়ার ও দলের সামগ্রিক সফর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিশ্বজয়ী এই অধিনায়ক স্মরণ করেন সাম্প্রতিক বিশ্বমঞ্চের লড়াইগুলো। শেষ বিশ্বকাপে নিজেদের শরীরের শেষ রক্তবিন্দু ও শক্তিটুকু দিয়ে লড়েছেন তারা। অতিমাত্রায় শারীরিক শক্তি ও ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া সেই টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে পুরো দল তাদের সবটুকু নিংড়ে দিয়েছিল। সেই ক্লান্তি ও কঠিন পরীক্ষা পেরিয়েও তারা ফাইনালে পৌছেছিলেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন। আর ২০২২ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি শুধু তার একক স্বপ্নপূরণ ছিল না, বরং ছিল গোটা আর্জেন্টিনা জাতির বহু বছরের স্বপ্নপূরণ।
বিদায়ী বক্তব্যে মেসি শুধু বর্তমান বিশ্বজয়ী দলকেই নয়, বরং গত দুই দশকে তার পাশে লড়ে যাওয়া প্রতিটি সতীর্থকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। কাতার বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা এবং ফাইনালিসিমা জয়ের অনেক আগে থেকেই যেসব ফুটবলার নীল-সাদা জার্সির মর্যাদার জন্য মাঠে নামতেন এবং লড়াই করেছেন, তাদের ত্যাগের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। সতীর্থদের তিনি আখ্যা দেন সত্যিকারের ‘যোদ্ধা’ হিসেবে, যাদের ওপর প্রতিটি ম্যাচে চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যেত। বিশেষ করে বর্তমান দলটির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মেসি জানান, শৈশব থেকে দেখে আসা তার সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি সত্যি করার পেছনে এই একঝাঁক তরুণের অবদান সবচেয়ে বেশি।
বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ভালোবাসায় মুগ্ধ মেসি ধন্যবাদ জানিয়েছেন তার অগণিত ভক্তদের। বুয়েনস এইরেস থেকে শুরু করে পৃথিবীর যেকোনো স্টেডিয়ামেই তারা খেলেছেন, মনে হয়েছে নিজেদের দেশেই খেলছেন—কারণ গ্যালারিতে সর্বদা উপস্থিত থাকত সমর্থনকারীদের বিশাল বহর। আর্জেন্টিনা ফুটবল দলকে ভালোবাসার এই ধারা যেন ভবিষ্যতেও বজায় থাকে, সেই আকুল আবেদনও জানান মেসি। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, সামনের পথচলায় কঠিন সময়ও আসবে এবং কিছু মানুষ সবসময় জাতীয় দলের ব্যর্থতা দেখার জন্য মুখিয়ে থাকবে। তাই দলকে সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং সমর্থকদের উচিত হবে কঠিন দিনগুলোতে দলের ওপর আস্থা ধরে রাখা।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ঘরের মাঠে প্রথম খেলার দিনটিকে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন আখ্যা দিয়ে মেসি বিদায়বেলায় নিজের হৃদয়ের সমস্ত আবেগ উজার করে দেন। জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি মনে পড়েছিল তার বাবার কথা। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে তৃপ্ত মেসি জানান, জাতীয় দলের হয়ে সম্ভাব্য সবকিছু জয় করে, নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে তিনি এখন এক অপার শান্তি নিয়ে বিদায় নিচ্ছেন। একজন গর্বিত আর্জেন্টাইন হিসেবে বিদায় নিলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন, আগামী দিনে যে কোনো নতুন মুখ বা যে দলই নীল-সাদা জার্সি গায়ে মাঠে নামুক না কেন, গ্যালারি ও পর্দার ওপার থেকে সবচেয়ে বড় সমর্থক হিসেবে তিনিই পাশে থাকবেন।