Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

❒ ছোটদের গল্প

মুনিয়ার নতুন খেলা

জুবায়ের হুসাইন জুবায়ের হুসাইন
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল,২০২৬, ০৯:৩২ এ এম
মুনিয়ার নতুন খেলা

স্কুল খুললেও নিয়মিত ক্লাস শুরু হয়নি এখনও। একটা দুইটা করে ক্লাস হচ্ছে।
নতুন বইয়ের ঘ্রাণ খুবই ভালো লাগে মুনিয়ার। অন্য রকম একটা ভালো লাগায় পেয়ে বসে।
এখন বেশিরভাগ সময় বাড়িতেই কাটছে। তাই একবার দাদুভাই, একবার আম্মু আর প্রায় সারাক্ষণ ভাইয়াকে জ্বালাতন করছে। রুমে এসে একেকবার একেকটা নতুন বই হাতে নিচ্ছে আর সবার কাছে গিয়ে পড়ে পড়ে শোনাচ্ছে।


ওর এতা এতো জ্বালাতনে কেউই কিন্তু জ্বলছে না। বরং উপভোগ করছে। আম্মু আর দাদুভাই তো ফিরে যাচ্ছেন তাদের শৈশবে। নতুন ক্লাসের নতুন বই হাতে পাওয়ার পর বাড়িতে এলে তাদের আব্বু সিমেন্টের কাগজ দিযে বইগুলো মুড়ে দিতেন। তখন সিমেন্টের প্যাকেটগুলো করা হতো ধূসর রঙের পুরু কগজ দিয়ে।
আর মুনিয়ার ভাইয়া মুরাদ তো ছোটো বোনের কোনো কথাতেই রাগ করে না। ছোটো বোনটিকে ও অত্যন্ত ভালোবাসে। যতো আবদার মেটাতে সবার আগে ছুটে যায়। খুনসুটিও চলে দু’জনে বেশ!
কোচিং থেকে বাসায় ফিরে সবেমাত্র বইখাতা রেখেছে মুরাদ, ছুটে আসে মুনিয়া। হড়বড় করে একগাদা কথা বলে ভাইয়াকে। প্রচণ্ড ক্ষিধে লাগলেও বসে আগে বোনের কথায় মনোযোগ দেয়।
মুনিয়া ভাইয়ার পাশে বসে বলে, ‘জানো ভাইয়া, নতুন বইয়ের ঘ্রাণ না আমাকে মাতাল করে দিচ্ছে! তুমি কি মাতার হচ্ছো তোমার নতুন বইয়ের গন্ধ শুকে?’
মুরাদ আদরের বোনটিকে কাছে টেনে নিলো। আলতো করে নাকটা টেনে দিয়ে বললো, ‘নতুন বইয়ের গন্ধ অমনই, আপুমণি। সবাইকে সে আনন্দে ভাসিয়ে দেয়। নতুন বই আমাদেরকে নতুন কিছু শেখায়।’


‘তুমি ঠিক বলেছো ভাইয়া। আমার নতুন বইগুলোতে অনেক নতুন নতুন কথা আছে।’
‘ও মা! তোমার পড়াও হয়ে গেছে?’ অবাক হবার ভান করে মুরাদ।
মুনিয়া জবাব দেয়, ‘সবগুলোই অল্প অল্প করে পড়েছি।’ হঠাৎ মুখটা অন্ধকার হয়ে গেলো।
মুরাদ সেটা দেখতে পেরে জিজ্ঞেস করলো, ‘কী হয়েছে মুনিয়া বোন? মুখটা হঠাৎ অমন দেখাচ্ছে কেনো?’
‘শুধু অঙ্কটা একটু কঠিন মনে হচ্ছে!’ জবাবে বললো মুনিয়া।
‘ও, এই কথা? আরে আমার বোনটির কাছে তো অঙ্ক, ইংরেজি এসব কিছুই না। তুমি গত বার্ষিক পরীক্ষায় অঙ্কে একশোতে একশো পেয়েছো!’
ফিক করে হেসে দিলো মুনিয়া। পাগলিটাকে দারুণ লাগছে এই মুহূর্তে।
‘অঙ্ক তো আমার কাছে পানির মতোন!’ বলে খানিকটা হেসে নিলো মুনিয়া। হাসি থামিয়ে আবার বললো, ‘তোমার তো প্রচণ্ড ক্ষিধে পেয়েছে। কোচিং থেকে এসেই তোমার খাওয়ার অভ্যাস। খেয়েদেয়ে বাগানে এসো ভাইয়া। জরুরি কাজ আছে।’ বলে খোলা দরোজা দিয়ে বেরিয়ে যায়।
মুরাদ অপলক সেদিকে তাকিয়ে আছে। ছোটো বোনের এই চঞ্চলতা ও বেশ উপভোগ করে। কিন্তু পিচ্ছিটা কী বলে গেলো? জরুরি কী কাজ আছে ওর?
এসব আর ভাবার সময় নেই। আগে পেটটাকে সামলাতে হবে। ক্ষিধে নামক ছুঁচোটা পেটের মধ্যে রীতিমতো দৌড়ানো আরম্ভ করে দিয়েছে।
বাগানের পশ্চিম কোনায় পুরনো দু’টো প্ল্যাস্টিকের বালতি রেখেছে মুনিয়া। সাদা কাগজে রঙ পেন্সিল দিয়ে ওর এবং ভাইয়ার নাম লিখে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিয়েছে। লেখাগুলোর মাঝে বিভিন্ন ডিজাইনও এঁকেছে।


ঘাসের ওপরে একটা সাদা পলিথিন বিছিয়ে তার ওপরে মাটি দিয়ে তৈরি ছোটো ছোটো মার্বেল বানিয়ে রাখা। পাশে পা ছড়িয়ে বসে কাদা নিয়ে হাতের তালুতে ঘুরিয়ে মার্বেল তৈরি করছে আর পলিথিনের ওপর রাখছে। মুরাদকে দেখে তাড়াতাড়ি পাশে বসে কাজে হাত দিতে বললো।
মুরাদ বসে পড়লো বোনের পাশে। দেখাদেখি বানাতে শুরু করলো কাদার মার্বেল। প্রথমটায় গোল না হলেও ধীরে ধীরে সুন্দর আকৃতি পেতে লাগলো।
‘এগুলো দিয়ে কী হবে বোন?’ জিজ্ঞেস করলো একসময় মুরাদ। ‘পাখি শিকার করবে?’
কটমট করে ভাইয়ার দিকে তাকালো মুনিয়া। বললো, ‘পাখি শিকার মোটেই ভালো কাজ নয়। আমরা ভালো কাজ করবো বলেই এগুলো বানানো হচ্ছে।’
‘সরি বোন।’ দুঃখ প্রকাশ করে বললো মুরাদ। ‘কিন্তু সোনা বোনটি আমার, আমরা কেনো বানাচ্ছি এগুলো, তা কি জানার অধিকার আছে আমার?’
‘একশোবার আছে। ভালো কাজটা তো আমরা দু’জন মিলেই করবো।’ পুনরায় হাসিতে ঝলমল করে উঠরো মুনিয়ার সমস্ত চেহারা। কথা না থামিয়েই আবার বললো, ‘নতুন বছরে আমরা নতুন একটা কাজ করবো। তবে ভাইয়া, এটাকে তুমি কাজ না বলে একটা প্রতিযোগিতা বলতে পারো। এটা একটা খেলা হবে।’
মুরাদের অবাক ভাব একটুও কাটছে না। মুনিয়ার এই রহস্যময় কথাবার্তা ওকে আরও বিস্মিত করছে। কিন্তু কিছু না বলে চুপ থাকলো। জানে, মুনিয়া নিজেই সবটা খোলাসা করবে এক এক করে। তাই কানখাড়া করে অপেক্ষায় রইলো পরবর্তী কথা শোনার জন্য।


‘শোনো ভাইয়া,’ বললো মুনিয়া। ‘এই মার্বেলগুলো শুকিয়ে গেলে আমরা সেগুলো দিয়েই খেলাটা আরম্ভ করবো। সামনে যে দু’টো বালতি দেখছো, একটাতে তোমার আর একটাতে আমার নাম লেখা-ও দু’টো আমাদের ফলাফল নির্ধারণ করবে।’
‘কিন্তু খেলাটা কী আপুমণি?’ নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করে বসলো মুরাদ।
‘এ কী ভাইয়া! তুমি অধৈর্য হয়ে উঠছো? খেলার আগেই হার মেনে নিচ্ছো? কিন্তু তা হবে না বলে দিলাম। খেলাটা থেকে কিছুতেই তুমি পালাতে পারবে না।’
‘আ’অ্যাম ভেরি ভেরি সরি, ম্যাডাম। অনুগ্রহ করে এবার বলবে কি আমরা কী খেলায় প্রতিযোগিতা করতে যাচ্ছি?’


ভাইয়ার মুখোমুখি হলো এবার মুনিয়া। তারপর তার চোখে চোখ রেখে বললো, ‘এটা হবে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা। আমরা প্রতিদিন একটা করে ভালো কাজ করার চেষ্টা করবো। আর প্রতিটা ভালো কাজের জন্য একটা করে মাটির মার্বেল রাখবো নিজের নিজের বালতিতে। বছর শেষে দেখবো, কে বেশি ভালো কাজ করেছে।’
চমকে উঠলো মুনিয়া। কী বুদ্ধিরে মেয়েটার! ওর এই বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হবে। বললো, ‘দারুণ খেলা হবে এটা আপুমণি! আমি রাজি।’
‘কিন্তু চিট করলে কিন্তু হবে না। সে জন্য দাদু ভাইকে আগে ভালো কাজের কথাটা জানাতে হবে। দাদুভাই যদি বলেন যে সেটা ভালো কাজ হয়েছে, তাহলেই কেবল মার্বেল ফেলা যাবে বালতিতে।’ প্রতিযোগিতার নিয়মটা আরও পরিষ্কার করলো মুনিয়া।


এবার দ্বিগুণ অবাক হবার পালা মুরাদের। প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনো প্রকার ফাকফোকর রাখতে চায় না মুনিয়া। মনটা আনন্দে হেসে উঠছে। নতুন বছরের এই সম্পূর্ণ নতুন প্রতিযোগিতাটা দারুণ পছন্দ হয়েছে ওর। প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য হলেও প্রতিদিন অন্তত একটি করে ভালো কাজ করার চেষ্টা করা হবে। তারমানে একটি বছর ধরে যদি এভাবে করা হয়, তাহলে নিশ্চিত ভালো কাজগুলো অভ্যাসে পরিণত হবে। ওর কাছে মনে হচ্ছে- ও যদি সব শিশু-কিশোরকে প্রতিযোগিতাটার মধ্যে শামিল করতে পারতো, তাহলে কতোই না ভালো হতো! প্রাণের চেয়ে প্রিয় বাংলাদেশটা ভালোকাজে ভরে যেতো। অন্যায়-অত্যাচার-অবিচার কোথাও থাকতো না। আব্বু তো প্রায়ই বলেন যে, দেশটা অন্যায়ে ছেয়ে গেছে। সমস্ত জায়গায় দুর্নীতি আর অনিয়মের রাজত্ব চলছে। ছোট্ট মুনিয়ার মতো করে যদি সবাই চিন্তা করতো, নতুন বছরে সবাই মিলে যদি দেশটা গড়তে এগিয়ে আসতো, তাহলে আগামীর বাংলাদেশ হতো সমৃদ্ধির। মানুষেরা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারতো। শান্তির পায়রারা উড়ে বেড়াতো প্রতিটি বাড়ির আঙিনায়।
দাদা ওদের অজান্তেই বাগানে এসে ওদের কাণ্ডকারখানা দেখছিলেন আর আলোচনা শুনছিলেন। শেষে বলে উঠলেন, ‘তোমরা হলে আমার চোখের মণি! কলিজার টুকরো! দেশের সব শিশু-কিশোররা তোমাদের মতো হোক। তোমাদের এই উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। চেষ্টা করতে পারো আরোও ছেলেমেয়েদেরকে এতে অংশগ্রহণ করানোর। তাতে ভালো কাজের সওয়াব তোমরাও পাবে।’


বিকেলের শেষ রোদ্দুরটুকু তার লালচে হলুদ আভা ছড়িয়ে ‘টুপ্’ করে দিগন্তের ওপারে হারিয়ে গেলো।
কয়েকদিন পরের কথা।
মুরাদ দেখলো-পাঁচদিনে মুনিয়ার বালতিতে জমা হয়েছে মাত্র দু’টো মাটির মার্বেল। আর ওর বালতিতে চারটে। নিজের দু’টো মার্বেল বালতি থেকে উঠিয়ে নিয়ে আদরের বোনের বালতির মধ্যে রেখে দিলো সবার অজান্তে।

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)