ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপটে সামনে আসা কথিত প্রেমিক ও হোটেল কর্মচারী রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু চৌধুরীকে নিয়ে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত রোববার (১১ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলী হোটেল-মোটেল জোন সংলগ্ন চন্দ্রিমা উদ্যান এলাকায় স্থানীয় লোকজন রাজুকে আটক করে রাখে। গণমাধ্যমে তাজমিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার খবর আসার পর স্থানীয়রা তাকে আটকে রেখে পুলিশে খবর দেন।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। তদন্তের স্বার্থে আনুষ্ঠানিক অধিযাচনপত্রের মাধ্যমে রাজুকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর ফের কক্সবাজার সদর মডেল থানা-পুলিশের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো লিখিত অভিযোগ বা এজাহার না থাকায় ধর্তব্য অপরাধের আশঙ্কায় তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
পুলিশ ও মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্রে গত ৬ অক্টোবর তাজমিন কক্সবাজারে যায়। সেখানে কলাতলী এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে রাজুর সঙ্গে অবস্থান করে সে। হোটেলটির নিবন্ধন খাতায় তাজমিনের নাম ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। পরদিন ৭ অক্টোবর সকালে তারা হোটেল ত্যাগ করে এবং রাজু নিজেই তাজমিনকে কুমিল্লার বাসের টিকিট কেটে দেয়। ওই রাতেই কুমিল্লা পৌঁছানোর পর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বাড়ি ফেরার পথে চালক সুমন মিয়া তাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
ঘটনার পর নিহত তাজমিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনের কললিস্ট ও অবস্থান পর্যালোচনায় রাজুর সম্পৃক্ততা পায় তদন্তকারী দল। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার (১১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার চন্দ্রিমা উদ্যান সংলগ্ন স্থান থেকে স্থানীয়দের সহায়তায় রাজুকে হেফাজতে নেয় সদর মডেল থানা-পুলিশ। পরবর্তীতে সোমবার সকালে কুমিল্লা ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই পবিত্র সরকার রাজুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কক্সবাজার পুলিশের কাছে লিখিত অধিযাচনপত্র দেন।
অধিযাচনপত্র পাওয়ার পর কুমিল্লা থেকে আসা ডিবির একটি দল কক্সবাজার সদর মডেল থানায় রাজুকে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করে। তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাজুকে কুমিল্লায় না নিয়ে পুনরায় কক্সবাজার থানা-পুলিশের হেফাজতে হস্তান্তর করে ফিরে যায় ডিবির দলটি।
যেহেতু হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি অটোরিকশাচালক সুমন ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে, তাই রাজুর বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা বা এজাহার না থাকায় পুলিশ তাকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করে।
এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, কুমিল্লা পুলিশ রাজুকে গ্রেপ্তার করে নিতে যায়নি; বরং হোটেলের ঘটনাবলিসহ তদন্তের প্রয়োজনে কিছু বিষয় যাচাই করার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, তাজমিনের পরিবার চাইলে রাজুর বিরুদ্ধে কক্সবাজারে আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারবে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. অহিদুর রহমান বলেন, ‘কুমিল্লা পুলিশের অধিযাচন অনুযায়ী রাজুকে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তারা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাজুকে পুনরায় ফেরত দিলে বিকেলে ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। হোটেলে অবস্থানকালে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে ভুক্তভোগীর পরিবার কক্সবাজার থানায় পৃথক মামলা দায়ের করতে পারে।’
তদন্তের বিবরণ অনুযায়ী, নিহত তাজমিন কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির অনিয়মিত ছাত্রী ছিল। তার পরিবার মূলত যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের বাসিন্দা হলেও বাবা আবদুল আলিমের চাকরির (রেনাটা পিএলসি) সুবাদে তারা কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত। গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর সঙ্গে হাতঘড়ি সংক্রান্ত বিরোধ ও মায়ের সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায় এবং পরে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করে কক্সবাজারে পৌঁছায়।
গত ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের বাবার করা হত্যা মামলায় গত শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লা ডিবি পুলিশ। সুমনের দেওয়া স্বীকারোক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তাজমিনের খোয়া যাওয়া আইফোনটিও উদ্ধার করেছে।