এম জামান
যশোর সদর উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়ন পরিষদ। ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর সদর উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়ন পরিষদে বিভিন্ন সেবা পেতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ জনগণ। সকাল ৯টায় অফিস টাইম হলেও লেবুতলা ইউনিয়ন পরিষদের চিত্র ছিল ভিন্ন। সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত পরিষদের একাধিক কক্ষে তালা ঝুলছিল। এদিকে সেবা প্রত্যাশীরা অপেক্ষা করছিলেন কখন আসবেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) ও কম্পিউটার উদ্যোক্তা। পরিষদে তখন হৃদয় নামের এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন । পরে ক্যামেরার উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি সচিবের কক্ষের তালা খুলে দেন। আজ সকালে সরেজমিনে পরিষদে গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়।
এ ইউনিয়নে ২০২২ সালের জনসংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৮৬২ জন। বর্তমানে সেই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এ জনগণের সেবা প্রত্যাশার একমাত্র জায়গা ইউনিয়ন পরিষদ, যেখানে প্রতিটি মানুষেরই কোনো না কোনো কাজে দৌড়ে আসতে হয়। অথচ সেখানেই ভোগান্তির শেষ নেই। অফিস টাইমেও অফিসের তালা লাগানো থাকে। বারান্দায় এবং বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে চলে যেতে হয় সেবা প্রত্যাশী মানুষদের।
এদিকে গ্রাম পুলিশেরও দেখা মেলেনি সকাল সাড়ে ১০টার আগে। অফিস নিয়ম অনুযায়ী অফিসে এসে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে পতাকা উত্তোলন করা হয়নি। নারী কম্পিউটার উদ্যোক্তা সকাল ৯টা ৫৪ মিনিটে অফিসে আসেন। পুরো পরিষদের পরিবেশ দেখে মনে হয়েছে যেন সরকারি ছুটি চলছে।
বর্তমানে বোরো ধান কাটার ব্যস্ততা নিয়ে কৃষক একপ্রকার পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছেন। আবহাওয়া কখনো মেঘলা, কখনো বাতাস, আবার কখনো বৃষ্টি নামছে। এর মধ্যে শ্রমিক সংকট রয়েছে প্রকট। আর ঠিক এ সময় পরিষদের বারান্দায় ভুক্তভোগীরা দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছেন হতাশা নিয়ে। দেখার মতো কেউ নেই—এমন পরিস্থিতিতে পুরো পরিষদে এক ধরনের অব্যবস্থাপনা ও অচলাবস্থা বিরাজ করছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এদিকে জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, নাগরিক সনদসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংগ্রহ করতেও সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় ঘুরতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, একটি জন্ম নিবন্ধন সংশোধন কিংবা নতুন নিবন্ধন পেতে কখনও কখনও কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। একইভাবে মৃত্যু সনদ বা নাগরিক সনদ তুলতেও নানা ধরনের জটিলতা ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার জনশুমারির তথ্য মতে, ২০২২ সালের লেবুতলা ইউনিয়নে মোট জনসংখ্যা ২৩ হাজার ৮৬২ জন। যার মধ্যে পুরুষ রয়েছেন ১১ হাজার ৭৪০ জন এবং নারীর সংখ্যা ১২ হাজার ১২০ জন। আর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রয়েছেন মাত্র ২ জন।
ভুক্তভোগীরা জানান, নির্ধারিত সময়ে সেবা না পাওয়ায় স্কুল-কলেজে ভর্তি, পাসপোর্ট আবেদন, সরকারি সহায়তা গ্রহণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে তারা সমস্যায় পড়ছেন। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, বারবার ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েও সঠিক তথ্য বা নির্দিষ্ট সময়ে পাচ্ছেন না। এতে জনগণের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
এদিকে প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা এবং অফিস সময়ের অনিয়মের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সমস্যা চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নাগরিক সেবা সহজ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ।
আন্দোলপোতা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা অলিউর রহমান জানান, ওয়ারিশ সনদের জন্য সকাল ৯ টায় ইউনিয়ন পরিষদে এসেছি। সকাল ১০টা পর্যন্তও সেখানে সচিব, প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ, এমনকি কম্পিউটার অপারেটরদের মধ্যেও কেউ আসেনি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, গ্রাম পুলিশেরও কোনো উপস্থিতি ছিল না এবং পরিষদে জাতীয় পতাকাও যথাসময়ে উত্তোলন করা হয়নি।
আলমগীর হোসেন জানান, তিনি তার সন্তানের জন্ম সনদের নাম ইংরেজিতে করার জন্য আবেদন করেছেন। প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস হয়ে গেলেও এখনো সনদ পাননি। এই পরিষদে একই কাজের জন্য তিন দিন আসতে হয়েছে। আজকে বলা হয়েছে কাজ হয়েছে, কিন্তু পরে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই সনদ না নিয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছি ।
রাব্বি হোসেন জানান, তার মা দুই সপ্তাহ আগে মারা গেছেন। মায়ের মৃত্যু সনদের কাগজ নিতে ইউনিয়ন পরিষদে এসেছি। সকাল ১০টা ১৮ মিনিট পর্যন্তও প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) আসেনি । ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করছে না।
ভুক্তভোগী নয়ন হোসেন জানান, আমার জন্ম সনদের জন্য চার মাস আগে সমস্ত কাগজপত্র জমা দিয়েছি। পরিষদের কথা অনুযায়ী ৩ থেকে ৪ বার ঘুরেও কোনো সমাধান পায়নি। পরে একজন ব্যক্তির সহায়তায় বিষয়টি পরের দিনই সমাধান পাই।
আন্দোলপোতা গ্রামের আবির হোসেন জানান, সকাল ১০টা বাজলেও পরিষদে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারি উপস্থিত নেই। সরকারি নিয়মে অফিস শুরু হওয়ার কথা সকাল ৯টায়। এদিকে জাতীয় পতাকা উত্তোলনও করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের অনুপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নিয়মিত ।
ফুলবাড়ী গ্রামের জাকির হোসেন জানান, একটি প্রত্যয়নপত্র নিতে সকাল ৯টায় এসে অপেক্ষায় আছি। কিন্তু ১০টা পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী আসেননি। প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়মিত অফিসে আসেন না, যার ফলে এলাকাবাসী নিয়মিত ভোগান্তির মধ্যে পড়ছে।
লেবুতলা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ দিলীপ কুমার জানান, তাদের ডিউটি ভাগ করে দেওয়া আছে। এখন আমার ডিউটি নেই, ব্যক্তিগত কাজে এসেছি পরিষদে। তিনি বলেন এখন ডিউটি উত্তম এবং ফশিয়ারের, ডিউটিতে তাদের থাকার কথা। কিন্তু সকাল ১০টা পর্যন্ত তাদের অফিসে দেখিনি।

কম্পিউটার উদ্যোক্তা আকলিমা বেগম জানান, আজ কিছুটা দেরিতে অফিসে এসেছি। তিনি স্বীকার করেন সকাল ৯ টা ৫৪ মিনিটে অফিসে এসেছি। তিনি বলেন আমাদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব ভাই) সাড়ে ৯টার আগে অফিসে আসেন না।
সকাল সোয়া ১০টার দিকে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) মো. ফেরদৌস হোসেন খান জানান, আজ অফিসে আসতে কিছুটা দেরি হয়েছে। ডিসি অফিসে কাজ ছিল। কি কাজ ছিল জানতে চাইলে গ্রামের বাড়ি বসুন্দিয়ায় ধান কাটার কাজে ব্যস্ত ছিলাম জানান।
পরিষদের প্রশাসক এবং উপজেলা সমবায় অফিসার তারিকুল ইসলাম জানান, “আমার মূল দায়িত্ব সমবায় অফিসে। লেবুতলায় চেয়ারম্যান না থাকায় ভারপ্রাপ্ত হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করছি। সপ্তাহে দুই থেকে এক দিন ইউনিয়ন পরিষদে বসার সুযোগ পাই। তবে কোনো মানুষের প্রয়োজনে কাগজপত্রের স্বাক্ষর লাগলে আমার কাছে আসলে আমি সঙ্গে সঙ্গে করে দেই। এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বশীল যারা আছেন তারা সময়মতো আসেন না—এ বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি আগামীকালের মিটিংয়ে সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন করব এবং কঠোর পদক্ষেপ নেব।”
যশোর সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার এবং এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট শাহরিয়ার হক বলেন, “সরকারি নির্ধারিত অফিস সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত সময়ের পরে অফিস করলে সেটা বিধির লঙ্ঘন। লেবুতলা ইউনিয়ন পরিষদের বিষয়ে যেসব অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে, সেগুলো আমরা যাচাই-বাছাই করব এবং খোঁজখবর নেব। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী জনগণের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কেউ যদি নিয়ম লঙ্ঘন করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইউনিয়নের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জনগণ যাতে প্রকৃত সেবা পায়, বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের অফিসগুলোতে, সে ব্যাপারে আমরা সোচ্চার আছি। সেবার মান উন্নয়নে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”
ধ্রুব/এস.আই