রফিক মণ্ডল, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) থেকে
কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এনামুল হাসান ইন্তাজুলের স্ত্রীর হাতে তুলে দেন নগদ অর্থ সহায়তা। ছবি: ধ্রুব নিউজ
"প্রশাসন মানে কেবল ফাইলের স্তূপ বা দাপ্তরিক আদেশ নয়; প্রশাসন মানে জনগণের সেবক। ইন্তাজুলের মতো অসহায় মানুষের কান্না যদি আমাদের কানে না পৌঁছায়, তবে এই পদের কোনো সার্থকতা নেই।"—সহায়তা প্রদানকালে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এনামুল হাসান।
তাঁর এই মানবিক উচ্চারণ আর "মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য"—ভূপেন হাজারিকার এই অমর সংগীতের সুর যেন বাস্তবে মূর্ত হয়ে উঠল ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে। সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে বিছানায় পড়ে থাকা এক অসহায় মানুষের করুণ আর্তনাদ যখন চারদিকের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল, ঠিক তখনই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে অনন্য এক নজির স্থাপন করলেন এই কর্মকর্তা। তাঁর এই সময়োচিত পদক্ষেপে এখন পুরো জেলাজুড়ে বইছে প্রশংসার জোয়ার।
হতদরিদ্র ইন্তাজুলের জীবনটা এক নিমেষে ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায়। প্রথমে যশোর পঙ্গু হাসপাতাল, তারপর ইনফেকশনের জটিলতায় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতাল—দীর্ঘদিন ধরে যমে-মানুষে টানাটানির পর যখন একটু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে খাট থেকে নামতে গিয়ে তৃতীয়বারের মতো পা ভেঙে যায় তাঁর। সেই থেকে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে শয্যাশায়ী জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি। অর্থের অভাবে থমকে গিয়েছিল চিকিৎসা, আর অনিশ্চয়তায় ডুবে যাচ্ছিল একটি সাজানো সংসার।
ইন্তাজুলের এই মানবেতর জীবনের চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে আসতেই তা নজরে আসে কোটচাঁদপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাসানের। সংবাদটি পড়ার পর তিনি বিন্দুমাত্র দেরি করেননি। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করেন ইন্তাজুলের পরিবারের সঙ্গে।
অসহায় পরিবারটিকে নিজের কার্যালয়ে ডেকে পরম মমতায় তাদের কষ্টের কথা শোনেন তিনি। কেবল আশ্বাস নয়, সঙ্গে সঙ্গেই ইন্তাজুলের স্ত্রীর হাতে তুলে দেন নগদ অর্থ সহায়তা। সেই সঙ্গে সরকারি ও ব্যক্তিগত—উভয় পর্যায় থেকে ইন্তাজুলের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ইউএনও জানান, তিনি সশরীরে ইন্তাজুলের বাড়িতে যাবেন এবং তাঁর সুস্থতার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবটুকুই করার চেষ্টা করবেন।
ইউএনও’র এই মহানুভবতায় ইন্তাজুলের পরিবার এখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে। ঝিনাইদহের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এই দ্রুত পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়ে বলছে, প্রশাসনের এমন জনবান্ধব রূপ সমাজের বিত্তবানদেরও অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করবে।
ইন্তাজুলের ঝাপসা হয়ে আসা চোখে এখন আবার সুস্থ হয়ে ওঠার স্বপ্ন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, এই কঠিন সময়েও এখনো সহমর্মী মানুষ আছেন, যারা নিভৃতে আর্তমানবতার সেবা করেন এবং প্রমাণ করেন যে—পৃথিবীতে আজও মানুষ মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।