বিশেষ প্রতিবেদক
রোববার সকালে যশোর কালেক্টরেটের অমিত্রাক্ষর সভাকক্ষে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয় ছবি: সংগৃহীত
যশোরে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সেনাবাহিনী, র্যাব ও আনসারসহ সকল বাহিনীর পক্ষ থেকে একটি শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিগত ৩টি নির্বাচনে প্রশাসন ও পুলিশের ওপর কলঙ্কের যে দাগ পড়েছে, তা মুছে দিয়ে ভবিষ্যতে স্মরণীয় হয়ে থাকার মতো একটি নির্বাচন উপহার দিতে যশোরের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তারা এখন বদ্ধপরিকর। রোববার সকালে যশোর কালেক্টরেটের অমিত্রাক্ষর সভাকক্ষে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় উপস্থিত সকল বাহিনীর প্রধানগণ এভাবেই তাদের কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেন। জেলা মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভা হলেও ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সভাটি কার্যত একটি উচ্চপর্যায়ের নির্বাচনী নিরাপত্তা সমন্বয় সভায় রূপ নেয়।
সভায় জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আশেক হাসান এবং পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল হাসান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, আমরা নিরপেক্ষতা অবলম্বনের জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কঠোর নির্দেশনা মেনে চলছি। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়তো অনেকের কাছে আমরা বিরাগভাজনের কারণ হচ্ছি, কিন্তু এটি আমাদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা ধরে রাখার জন্যই। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে এমন যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। সভায় একই ধরণের কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেন সেনাবাহিনীর ২ ইস্ট বেঙ্গলের উপ-অধিনায়ক মেজর মাসুদ, র্যাবের কোম্পানি কমান্ডার মেজর ফজলে রাব্বি, এনএসআই-এর যুগ্ম পরিচালক আবু তাহের মো. পারভেজ এবং আনসারের জেলা কমান্ডার মো. সেফাউল হাসান।
যশোর জেলা দেশের মধ্যে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে উল্লেখ করে সভায় জানানো হয়, জেলার ৮২৪টি ভোটকেন্দ্রের সবকটিই ইতোমধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র যশোর জেলাই এখন পর্যন্ত সব কেন্দ্রে এই প্রযুক্তি নিশ্চিত করতে পেরেছে। নিরাপত্তার আধুনিকায়নে কেন্দ্রগুলোর জন্য ৭১টি বডি ওন (দেহের সাথে) ক্যামেরা বরাদ্দ থাকবে, যা সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ সুপার ও রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এমনকি প্রার্থী ও অনুমোদিত সাংবাদিকরাও সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে এটি দেখতে পারবেন। এছাড়া পুলিশের কাছে অতিরিক্ত আরও ৩০০টি বডি ওন ক্যামেরা থাকবে যা সার্বক্ষণিকভাবে ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করবে। নির্বাচনী নিরাপত্তায় প্রতি কেন্দ্রে মোট ১৩ সদস্যের নিরাপত্তা টিম থাকবে, যার মধ্যে ৩ জন অস্ত্রধারী পুলিশ এবং আনসারের ৪ জন নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে আনসারের ৩ জন ও সাধারণ কেন্দ্রে ২ জন অস্ত্রধারী সদস্য মোতায়েন থাকবে। জেলাজুড়ে ৮২৪টি কেন্দ্রে কাজ করবেন ২৫ শতাধিক পুলিশ সদস্য এবং ১০ হাজার ৭১২ জন আনসার সদস্য। এছাড়াও সীমান্তে বিজিবি টহল থাকবে। এবারই প্রথম সব পুলিশ সদস্যকে ভোটের বিশেষ ট্রেনিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে।
গত ১২ জানুয়ারি থেকে সেনাবাহিনী মাঠে রয়েছে এবং বর্তমানে তাদের টহল আরও জোরদার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে জেলায় ৬৭টি টহল পরিচালনা করেছে। মেজর মাসুদ জানান, সেনাবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে যশোরের তিনটি ভিন্ন স্পট থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। নির্বাচন বানচালের যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখতে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রার্থী ও সাংবাদিকদের গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে সরাসরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
জেলা রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ আশেক হাসান জানান, জেলায় ৩০ হাজারের বেশি পোস্টাল ব্যালটের আবেদনের মধ্যে ৫০ শতাংশ ভোট জমা পড়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে এবং কিউআর কোড স্ক্যান করে সঠিক ভোট নির্ধারণ করা হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত আসা ভোটগুলো গণনার আওতায় আসবে। শনিবার গভীর রাতে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সকল মালামাল যশোরে পৌঁছেছে এবং বর্তমানে তা ট্রেজারিতে সংরক্ষিত আছে। সোমবার থেকে এসব মালামাল উপজেলায় পাঠানো শুরু হবে। এছাড়া জননিরাপত্তার স্বার্থে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঝিকরগাছার গদখালী ফুলের পার্ক ও বাজার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নির্বাচনের দিন অতিপ্রয়োজনীয় দোকান ছাড়া সকল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। মাঠে কাজ করার জন্য ১২ জন ম্যাজিস্ট্রেটের পাশাপাশি আরও ৪০ জন নতুন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচনী অপরাধ তদন্তে ৬ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা, ডিডিএলজি ও পৌর প্রশাসক রফিকুল হাসান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইরুফা সুলতানা, জেলা পিপি ও বিএনপি সভাপতি অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবু, চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মিজানুর রহমান খান এবং প্রেসক্লাব সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন।