শেখ জালাল
ছবি: প্রতীকী
যশোরের রাজনীতির মাঠে এখন সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিএনপির সেইসব প্রভাবশালী নেতাদের প্রত্যাবর্তন, যারা চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও চাল চুরির মতো গুরুতর অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে কৌশলী অবস্থানের দোহাই দিয়ে একে একে এসব নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করছে দল। প্রশ্ন উঠেছে—এই প্রত্যাবর্তনের ফলে যশোরে বিএনপি কি সত্যিই সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হবে, নাকি জেলায় ফিরবে সেই পুরনো দখলদারিত্ব ও ‘পেশিশক্তি’র সংস্কৃতি?
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় আওয়ামী শাসনামলে কোণঠাসা থাকার পর, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে যশোরে বিএনপি মূল শক্তিতে পরিণত হয়। সে সময় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল—যশোরে একটি স্বচ্ছ ও ক্লিন ইমেজের রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হবে। উল্টো বিএনিপির এক শ্রেণির নেতাকর্মী ‘দেশ উদ্ধারের দায়িত্বে নেমে পড়ে’। ১৭ বছরের ক্ষুধা মেটানোর নামে যা খুশি তাই শুরু করে। যা ফ্যাসিস্ট আমলেও চেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বেসুমার চাঁদাবাজি হয়। এ পরিস্থিতিতে দলীয় ইমেজ রক্ষা করতে বহিস্কারের মত কঠিন সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। যদিও বিপথগামী হাজার হাজার কর্মীর মধ্যে মাত্র কয়েকশকে বহিস্কার করা হয়। সংখ্যায় কম হলেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রশংসা কুড়িয়েছিল যশোর জেলা বিএনপি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি থেকে সরে এসে বিতর্কিতদের পুনর্বাসন করায় সাধারণ মানুষ ভবিষ্যত নিয়ে সংকিত হয়ে পড়েছে।
যশোরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে শার্শা উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি রুহুল কুদ্দুসের পদ ফিরে পাওয়া নিয়ে। গত বছরের ৫ মার্চ ১৫৫ বস্তা সরকারি চাল লুটের সুস্পষ্ট অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। নিজের জনসমর্থন প্রমান করতে সে সময় তিনি প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন, এরপরেও তাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়নি। জেলা বিএনপি তখন বলেছিল, অপরাধীর কোনো জায়গা দলে নেই। অথচ গত ৩০ জানুয়ারি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে তিনি শার্শার রাজনীতিতে আবারও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
একই চিত্র মণিরামপুরেও। মণিরামপুর উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোতাহারুল ইসলাম রিয়াদ, যার বিরুদ্ধে স্বয়ং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের নাজির শাহীন আলমকে চড়-থাপ্পড় মারার অভিযোগ রয়েছে। সেই লাঞ্ছনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে তাকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু গত ৫ জানুয়ারি ২০২৬-এ তাকে সপদে বহাল করা হয়েছে। সাধারণ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ওএমএস ডিলার নিয়োগের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং এলাকায় একক আধিপত্য বজায় রাখতেই রিয়াদের মতো নেতাদের পুনরায় পদায়ন করা হচ্ছে।
জেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক কমিটির সদস্য একে শরফুদ্দৌলা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্য খাতে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর হাসপাতাল সুপার ডা. হারুন অর রশিদকে লাঞ্ছিত করেন। তৎকালীন জেলা আহবায়ক কমিটির সদস্যের এ আচরণ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে কেন্দ্র বিএনপি তাকে বহিষ্কার করে। একই ঘটনায় যুবদলের নেতা হাবিবুল্লাহও বহিস্কৃত হন। কিন্তু সম্প্রতি একে শরফুদ্দৌলা ওপর থেকেও সেই শাস্তির খড়গ নামিয়ে নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি তার অব্যহতি আদেশ প্রত্যাহার করে নেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী।
বিএনপি ও যুবদলের নেতাদের চাঁদাবাজি ও নানা অনিয়মের তথ্য নিয়ে ফেসবুকে সরব হয়েছিলেন যুবদল নেতা ইস্কান্দার আলী জনি। যিনি এক সময় জেলা বিএনপির অফিস পিয়ন ছিলেন। তিনি জেলা নেতাদের নাম ধরে ধরে ফেসবুকে লাইভ করেন। তিনি জানান দেন আওয়ামী লীগ নেতাদের ভারতে যাওয়া সুযোগ করে দিয়ে কে কত টাকা আয় করেছেন। সে সময় তার অভিযোগ আমলে না নিয়ে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিস্কার করা হয় জনিকে। পরবর্তীতে মামলাও দেয়া হয়। কারাবরণ করেন জনি। কারামুক্ত হয়ে জনি যশোর ছেড়ে দেশের বিভিন্ন প্রাপ্তে বিএনপির ভোট প্রচারণা চালাচ্ছেন।
চৌগাছার বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড় দখলকে কেন্দ্র করে গত ২৮ জানুয়ারি ২০২৫-এ বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ৭ জন মারাত্মক আহত হন। এই ঘটনার জেরে চৌগাছা সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুর রহিমকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। অন্যদিকে, আওয়ামীপন্থী ব্যবসায়ীদের হুমকি ও স্থাপনা ভাঙচুরের অভিযোগে সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আঞ্জুরুল হকের নির্দেশে একইসাথে ১৩ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, যাদের অনেকেই এখন তলে তলে দলে ফেরার গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে গেছেন।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর গত সাত মাসে যশোর জেলা বিএনপির কাছে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দখল ও চাঁদাবাজির প্রায় দুই শতাধিক অভিযোগ জমা পড়ে। এর ভিত্তিতে শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে এখন সেই চিত্র উল্টো।
জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু জানিয়েছেন, প্রায় দুই শতাধিক নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ক্ষমা চেয়ে আবেদনের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ জনের পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের পর বহিষ্কৃত হওয়া প্রায় ৩০ জন নেতার পদ বহাল করা হয়েছে। তার দাবি, আগামী নির্বাচনে তারা দলের হয়ে কাজ করবেন—এই বিবেচনায় তাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
যশোর জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতারা বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অস্বস্তিতে থাকলেও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নেতা বলেন, যাদের বিরুদ্ধে জনগণের সরাসরি অভিযোগ আছে, তাদের কৌশলী কারণে ফিরিয়ে আনা দীর্ঘমেয়াদে দলের জন্য আত্মঘাতী হবে। এতে রাজপথের ত্যাগী কর্মীদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে।
সাধারণ মানুষের মতে, ৫ আগস্টের পর মানুষ বিএনপির কাছ থেকে যে নতুন ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রত্যাশা করেছিল, যশোরে বিতর্কিত নেতাদের এই ‘পাপ মোচন’ সেই প্রত্যাশাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।