শেখ জালাল
ভৈরব চত্বরে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের নির্বাচনী পথসভায় বক্তব্য রাখেন হাসনাত আব্দুল্লাহ ছবি: ধ্রুব নিউজ
যশোর : একটি দলের শীর্ষ নেতা নিজে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে কথা বলছেন, অথচ মাঠ পর্যায়ে তাদের কর্মীরা ‘না’-এর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন—এটাই তাদের দ্বিমুখী রাজনীতি। তারা ভারতের দালালি করার চেষ্টা করছে এবং সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিতে লিপ্ত। তারা বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজন, চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে না। আমরা ১১ দলীয় জোট ইনসাফের পক্ষে রয়েছি এবং এখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি।
শনিবার (০৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১২টায় যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র ভৈরব চত্বরে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় ঐক্যজোটের নির্বাচনী পথসভায় এসব কথা বলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং কুমিল্লা-৪ আসনে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, এই নির্বাচন কেবল ভোট নয়; এটি আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তির নির্বাচন, রাষ্ট্র গঠনের নির্বাচন এবং ফ্যাসিবাদকে চিরতরে কবরস্থ করার নির্বাচন। আগামী ১২ তারিখ সকাল সাড়ে সাতটা থেকে সবাইকে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হবে এবং ফলাফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। সেদিনই যশোরবাসী লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করবে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, গতকাল প্রশাসনের আচরণ সবাই দেখেছেন—যা ছিল এক ধরনের ‘টেস্ট ম্যাচ’। আবারও পুরোনো আওয়ামী কায়দায় পুলিশকে ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে।
তিনি পুলিশদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের মনে রাখতে হবে, আপনারা যে পোশাক পরেন তা আপনারা নিজ মেধায় অর্জন করেছেন। জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে যান। আপনারা বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকুন, কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে নয়। আপনারা জনগণের জন্য কাজ করেন এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন পান।
পুলিশের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, একসময় ডিবি হারুন বা বেনজীর আহমেদের মতো প্রতাপশালী লোকেরাও জনগণের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিল, কিন্তু আজ তারা কোথাও নেই। আপনারা জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের কথা ভুলে যাবেন না; গুলি ও গোলাবারুদ দিয়েও সেদিন জনস্রোত থামানো যায়নি। তাই গোলামি মানসিকতা পরিত্যাগ করুন। আগের তিনটি নির্বাচনের মতো আর কোনো প্রহসনের নির্বাচন আমরা হতে দেবন না।
হাসনাত আব্দুল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আপনারা অবৈধ টাকার মোহ থেকে দূরে থাকুন। আজ একদিন গোলামি করলে আগামী পাঁচ বছর রাজনৈতিক নেতাদের কাছে পোস্টিং ও বদলির জন্য দাসত্ব করতে হবে। আপনাদের বিএনপির পুলিশ, জামায়াতের পুলিশ কিংবা এনসিপির পুলিশ হওয়ার দরকার নেই—আপনারা বাংলাদেশের পেশাদার পুলিশ হন। আপনারা কলঙ্কমুক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করুন, পুরো বাংলাদেশ আপনাদের পাশে থাকবে এবং সহযোগিতা করবে।
নির্বাচনী কৌশল নিয়ে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে হাসনাত বলেন, আপনাদের প্রত্যেকের মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে—ভোট কোনো প্রার্থীর পকেটে নয়, ভোট রয়েছে জনগণের হাতে। এমনকি যিনি আজ বাধ্য হয়ে চাঁদাবাজি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তিনিও তার সন্তানের জন্য একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ চান। তাদের কাছে ইসলামের ও ইনসাফের দাওয়াত নিয়ে যান। আগামী ১২ তারিখের পর দেশ কেমন হবে—তা আজ আপনাদের ভূমিকার ওপরই নির্ধারিত হবে।
বিএনপির তৃণমূলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি জানি ধানের শীষের অনেক ত্যাগী নেতা-কর্মী আছেন যাদের ওপর বর্তমানে নানা ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। তারা মনে অনেক কষ্ট নিয়ে গোপনে আমাদের এসব কথা জানান। বিএনপি এখন অনেক নিবেদিত প্রাণ নেতা-কর্মীকে অবমূল্যায়ন করছে। আপনারা তাদের কাছে যাবেন। তারা হয়তো ধানের শীষের মিছিল নিয়ে কেন্দ্রে যাবেন, কিন্তু ব্যালটে ভোট দেবেন ১১ দলীয় ঐক্যজোটে। আপনারা তাদের কাছে আমাদের এই পরিবর্তনের দাওয়াত পৌঁছে দেবেন।
স্থানীয় সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যারা জমি দখল করে, টেন্ডারবাজি করে তারাই আজ আমাদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এতেই স্পষ্ট বোঝা যায়, তারা ক্ষমতায় গেলে দেশ ও জনগণের সাথে কী আচরণ করবে। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে। ইনশাআল্লাহ, দাড়িপাল্লা ও শাপলা কলির বিজয় নিশ্চিত হবে। আমরা সবাইকে নিয়ে একটি বৈষম্যহীন সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলব।
পথসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের শরিক দল জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ভিপি আব্দুল কাদের বলেন, হাসনাত শুধু একজন ব্যক্তির নাম নয়—হাসনাত আব্দুল্লাহ অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ‘পারমাণবিক বোমা’ সদৃশ প্রতীক। যশোরবাসী আর কোনো চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও নারী নির্যাতনকারীকে নেতৃত্বে দেখতে চায় না। আগামী ১২ তারিখে হাসনাত আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে জনগণের শক্তিতেই জয় নিশ্চিত হবে। সেদিন যশোরের সব সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের লাল কার্ড দেখানো হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা সাকিব শাহরিয়ার। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।
পথসভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নাগরিক পার্টি যশোর জেলার প্রধান সমন্বয়কারী নুরুজ্জামান। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর যশোর জেলার সহকারী সেক্রেটারি শামছুজ্জামান, দপ্তর সম্পাদক নূর আলী নূর আল মামুনসহ জোটের বিভিন্ন শরিক দলের শীর্ষ নেতারা। সভা শেষে ভৈরব চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য নির্বাচনী মিছিল বের হয়, যা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে।