যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি’তে একটি হ্যালোইন পার্টিতে এভাবেই দেখা গেছে যশোর-৩ আসনের পলাতক সাবেক সংসদ সদস্য ও জেমকন গ্রুপের পরিচালক কাজী নাবিল আহমেদকে। ছবি: জুলকারনাইন সায়েরের ভিডিও থেকে নেওয়া
‘তিনি এসে রোবটের মতো কথা বলতেন, ছড়ি ঘোরাতেন, আর কাজ শেষে হুট করে গায়েব হয়ে যেতেন।’ সেই রোবট মার্কা সাবেক এমপি কাজী নাবিল আহমেদ আজ কোথায়?
বিনা ভোটে একবার, রাতের ভোটে একবার, আর শেষে নিজেদের ভোটে আরো একবার এভাবে পরপর তিনবার যশোর-৩ আসনের এমপি হয়ে রাজনীতি চালিয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু বিপদের দিনে সেই নেতাকর্মী ও যশোরবাসীকে ফেলে বহু আগেই পাড়ি জমায়েছেন বিদেশে। অথচ এখন সেই সুদূর ওয়াশিংটনে হ্যালোইন পার্টিতে খোশমেজাজে রঙিন আলোয় নাচছেন কাজী নাবিল!
আমেরিকার সেই ঝকঝকে পার্টির ভিডিও ফুটেজ সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যা দেখে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের আফসোস আর আক্ষেপ মিশিয়ে লিখেছেন:
“আহহা নাবিল সাহেব, আপনার তো এখন ঢাকায় থাকার কথা! সামনে কত আয়োজন বাকি! আপনার অনুসারীদের বিপদে পাশে না দাঁড়িয়ে এভাবে ওয়াশিংটনে পার্টি করলে চলবে?”
তিনি লিখেছেন, ‘সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি’তে একটি হ্যালোইন পার্টিতে এভাবেই দেখা গেছে যশোর-৩ আসনের পলাতক সাবেক সংসদ সদস্য ও জেমকন গ্রুপের পরিচালক কাজী নাবিল আহমেদকে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের এই নেতার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা চলমান রয়েছে।’
যশোরের সাধারণ মানুষ তো দূরে থাক, নিজের দলের সাধারণ কর্মীরাও কখনো তার নাগাল পেত না। ক্ষমতা থাকা অবস্থায় এলাকার মানুষের দুখ-কষ্ট বা নেতাকর্মীদের খবরাখবর রাখা তো দূরের কথা, এমপির কাছে পৌঁছানোই ছিল যেন পাহাড় ডিঙানোর মতো শক্ত কাজ। অথচ দলের ভেতরে কোন্দল তৈরি করা আর চ্যালা-চামুণ্ডাদের নিয়ে রাজত্ব করার কোনো সুযোগই তিনি ছাড়েননি। শুধু তাই নয় জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগের যে কয়জন সৌভাগ্যবান এমপি কোন ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েননি তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। যশোরে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী শাহিন চাকলাদের বাড়িতে আগুন ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, কয়েকটি গাড়ি পুড়ে গেছে, সবচেয়ে বড় ঘটনা তার মালিকানাধীন পাঁচ তারকা হোটেল জাবের পুড়েছে দুবৃত্তের আগুনে। সেই আগুনে মারা গেছে ২৪ প্রাণ। অথচ শাহিন চাকলাদারের বাড়ির পাশেই নাবিলের বাড়ি হলেও সেখানে কেউ একটা ঢিলও ছোড়েনি। বলতে গেলে তার সহায় সম্পদ অটুট আছে।
আজ রাজনীতি ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনে যখন তাঁর অনুসারীরা দিশেহারা, তখন অন্য নেতারা যেমন বিপদের মধ্যেও ছায়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন, উপহার পাঠাচ্ছেন কিংবা খোঁজ নিচ্ছেন; তখন নাবিল সাহেবের উল্টো রূপ দেখছেন নেতা কর্মিরা। অনুসারীদের পেছনে ফেলে তিনি মেতে আছেন প্রবাস-বিলাসে।
রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হওয়ার পাশাপাশি এই জেমকন পরিচালকের ঘাড়ে চেপেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা। জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অঢেল সম্পদ গড়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা তদন্তাধীন।
দুদকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ১০৯ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন ও অগণিত জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পত্তি জমেছে তাঁর ঝুলিতে। আদালতের নির্দেশে তাঁর কোটি কোটি টাকার জমি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং ব্যাংকের শেয়ার ইতোমধ্যে ফ্রিজ করা হয়েছে।
যে মানুষটি যশোরে একসময় দাপট দেখিয়ে চলতেন, আজ তিনি দেশের আইন ও নিজের দেশের মানুষের কাছ থেকে বহু দূরে, অন্য দেশে রঙিন আলোয় আনন্দ নাচছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের একটি প্রশ্নই এখন বাতাসে ভাসছে— আহা নাবিল সাহেব, নিজেদের বিপদে ফেলে ওয়াশিংটনে এই নাচ নাচতে আপনার একটুও বাধল না?