❒ জুলাইয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ
ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
সাত আসামির সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অপর আসামিরা হলেন— কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
উল্লেখ্য, সাত আসামির সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
ট্রাইব্যুনাল কাদের, নাছিম, আরাফাত, পরশ ও মাইনুলের অর্ধেক সম্পদ বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দিয়েছেন। বাজেয়াপ্ত এসব সম্পদ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ের পর ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, 'আমাদের ট্রাইব্যুনালের রুলস অ্যান্ড স্ট্যাটিউটসে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করার বিধান আছে। এবারই প্রথম আমাদের ট্রাইব্যুনাল তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করেছে।'
তিনি বলেন, 'সেই ৫০ শতাংশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই ফাউন্ডেশন বা বিধিবদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদ ও আহতদের মধ্যে বিলি বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট এবং মনে করি, এটি একটি প্রত্যাশিত রায় হয়েছে। প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, ২৫ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এই শহীদ ও আহতদের প্রতি আজ ন্যায়বিচার করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি।'
এর আগে গত ১৭ আগস্ট মামলাটির যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। ২ আগস্ট মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। এতে তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষের ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।
গতকাল (১৪ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন ধার্য করেন।
গত ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর একই ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে আসামিরা যৌথভাবে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন এবং উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। সহিংসতার পরিকল্পনায় তারা কয়েকটি বৈঠকও করেন। একই সঙ্গে দলীয় নেতা-কর্মীদের রাজপথে নেমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপক্ষ আরও অভিযোগ করে, আসামিরা বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র হামলা, ব্যাপক দমন-পীড়ন এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সারা দেশে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রপক্ষের মতে, এসব কর্মকাণ্ড আইনে শাস্তিযোগ্য মানবতাবিরোধী অপরাধ।
এর আগে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গত বছরের ১৭ নভেম্বর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। হাসিনার রায়ের প্রায় ১০ মাস পর ওবায়দুল কাদের ও অন্য ছয় আসামির মামলায় এই রায় দেওয়া হলো।
ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ওই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলায় এটি সপ্তম রায়।
সাত আসামির বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
জুলাই আন্দোলনের সময় সাত আসামির বিরুদ্ধে চার ধরনের অভিযোগ আনা হয় এই মামলায়।
১. উসকানি ও প্ররোচনা: জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে যৌথভাবে উসকানিমূলক ও প্ররোচনামূলক বক্তব্য দেওয়া এবং নির্দেশ জারি করা।
২. সহিংসতার পরিকল্পনা: আন্দোলন দমনের জন্য বিভিন্ন বৈঠক করে সশস্ত্র হামলা ও সহিংসতা চালানোর পরিকল্পনা করা।
৩. দখল ও দমন-পীড়ন: দলীয় নেতা-কর্মী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজপথে নেমে আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালাতে নির্দেশ দেওয়া।
৪. 'শ্যুট অ্যাট সাইট' নির্দেশ: কারফিউ জারি ও 'শ্যুট অ্যাট সাইট' (দেখামাত্র গুলি) আদেশের মতো বিষয়গুলো গণমাধ্যমে প্রচার ও বাস্তবায়ন করা।
আসামিদের এসব নির্দেশ ও উসকানির ফলে দেশব্যাপী ব্যাপক সহিংসতা, হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয় বলে অভিযোগে বলা হয়।
যে অভিযোগে যার যত সাজা
ওবায়দুল কাদেরকে ১ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড, ২ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড, ৩ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড এবং ৪ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বাহাউদ্দিন নাছিমকে ১ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। ২ নম্বর অভিযোগ থেকে খালাস পান তিনি। ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগ একত্রে বিবেচনায় নিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় তাকে।
মোহাম্মদ আলী আরাফাতকেও ১ ও ৪ নম্বর অভিযোগ একত্রে বিবেচনায় নিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। ২ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাকে। ৩ নম্বর অভিযোগ থেকে খালাস পান তিনি।
পরশকে ১ নম্বর অভিযোগ থেকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল। ২ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড, ৩ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং ৪ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
মাইনুলকে ১ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২, ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আলাদা ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সাদ্দামকে ১ ও ২ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে আলাদা আলাদা আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগ একত্রে বিবেচনায় নিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
ইনানকে ১ ও ২ নম্বর অভিযোগে পৃথকভাবে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগ একত্রে বিবেচনায় নিয়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।
আসামিদের আইনজীবীরা যা বললেন
সাত আসামির সবাইকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার বিচারকাজ চলে। তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে শুনানি করেন এম হাসান ইমাম ও আইনজীবী ইসরাত জাহান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এম এইচ তামীম।
রায়ের পর রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী ইসরাত জাহান সাংবাদিকদের বলেন, 'সকল সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ডকুমেন্টের ওপর ভিত্তি করে আসামিদের খালাস করানোর জন্য আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।'
তিনি বলেন, 'আইন অনুযায়ী যেভাবে এগোনো যায়, সেভাবেই আর্গুমেন্ট ও জেরা করেছি। কিন্তু মাননীয় ট্রাইব্যুনাল আমার চার আসামির বিভিন্ন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ও আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন।'
সাদ্দাম, ইনান, নিখিল ও পরশের এই আইনজীবী বলেন, 'ট্রাইবুনালের রায় মানতে আইনজীবী হিসেবে আমরা বাধ্য। ট্রাইবুনালের রায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো ধৃষ্টতা আমাদের নেই। ট্রাইবুনালের রায় মানি, মান্য করি। কিন্তু আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট নই।'
কাদের, নাছিম ও আরাফাতের আইনজীবী হাসান ইমাম বলেন, 'আমরা সর্বোচ্চভাবে চেষ্টা করেছি। জেরা করেছি, আর্গুমেন্ট করেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রিন্সিপাল অব কমন রেসপনসিবিলিটির সুবিধা-অসুবিধা সবকিছু মাননীয় ট্রাইব্যুনালে ব্যাখ্যা করেছি। রায়ে আমাদের এসব বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না, রায় না দেখে বলতে পারব না।'
হাসান ইমাম বলেন, 'আমি একজন জজ ছিলাম। সেই হিসেবে বলছি, মাননীয় বিচারপতিদের জাজমেন্টের বিরুদ্ধে কথা বলার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই, কিংবা বলার মতো ধৃষ্টতাও নেই। তবে আমিও এই রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারিনি।'
সুযোগ থাকলে আপিল করা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, 'আপিলে হয়তো আমরা আরও ভালো কোনো ফল পেতে পারি, ইনশাল্লাহ, আগামী দিনগুলোতে।