ফিচার ডেস্ক
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মায়ের হাত ধরে বেরিয়ে এলো সাত বছরের শিশু মোবাশ্বেরা। ছবি: সংগৃহীত
কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক দিয়ে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মায়ের হাত ধরে বেরিয়ে এলো সাত বছরের শিশু মোবাশ্বেরা। কারাগারই ছিল তার জন্ম ও বেড়ে ওঠার ঠিকানা। বাইরের পৃথিবী কেমন, তা জানার সুযোগ হয়নি। নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় খালাস পেয়ে মা কামরুন্নাহার মনি মুক্তি পাওয়ার দিন মোবাশ্বেরারও শেষ হলো কারাজীবন।
এদিন দুপুরে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মোবাশ্বেরার মা কামরুন্নাহার মনি মুক্তি পান। একই দিন ওই মামলায় খালাস পাওয়া সাত জন গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
এর আগে, নুসরাত হত্যা মামলার আসামি কামরুন্নাহার মনি গ্রেপ্তারের সময় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ২০১৯ সালে ওই অবস্থাতেই কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। কারাবাস চলাকালে জন্ম হওয়া কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় মোবাশ্বেরা। জন্মের পর থেকে মায়ের সঙ্গে কারাগারেই কেটে যায় সাতটি বছর।
এদিকে কারাগারের বাইরে অপেক্ষা করা স্বজনরা ফুলের মালা ও তোড়া দিয়ে তাদের বরণ করে নেন। এ সময় মায়ের মুক্তির সঙ্গে শিশু বেরিয়ে আসার ঘটনাটি উপস্থিত সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
কারাগার থেকে মুক্তির পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কামরুন্নাহার মনি। মেয়ের কারাজীবনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানের জন্ম কারাগারেই, সাতটি বছর কারাগারেই ছিল। কারাগারে তাকে আমি দ্বিতীয় শ্রেণির বই পড়াচ্ছি, কোরআনের একটি পারা মুখস্থ করিয়েছি, কোরআন পড়তে শিখিয়েছি। আমার সর্বাত্মক দায়িত্ব পালন করেছি।’
মেয়ের পড়াশোনার জন্য কারাগারের ভেতরেই নিজের মতো করে ব্যবস্থা করেছিলেন মনি। তিনি বলেন, ‘আমি একটি জামা কেটে তাকে একটি স্কুলব্যাগ বানিয়ে দিয়েছি। সে স্কুলে যেত তিনটি বই নিয়ে। স্কুলব্যাগ কেমন হয়, সে তো জানে না। স্কুলব্যাগ নিয়ে স্কুলে যেতে হয়, তা আমি তাকে কারাগারের ভেতর থেকেই শিখিয়েছি।’
মোবাশ্বেরার শৈশব আর অন্য শিশুদের মতো নয়। কারাগারের পরিবেশ, মায়ের সঙ্গ আর সীমিত পরিসরই ছিল তার পৃথিবী। সেখানেই পড়াশোনার হাতেখড়ি, মায়ের কাছ থেকে কোরআন শেখা এবং বেড়ে ওঠা। কারাগারের চার দেওয়ালের বাইরে বিশাল পৃথিবীটি এখন তার কাছে একেবারেই নতুন।
মনি বলেন, ‘আমার মেয়ে যে বাইরের জীবনটা, তাকে বাইরে দিয়ে দিলে সে ভালো থাকত না। সন্তান মা ছাড়া কখনো ভালো থাকে না। মা যেভাবে যত্ন করে রাখে, কখনো কেউ রাখে না। মা হচ্ছে একটা চাদর।’
কারামুক্ত অন্যদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও ছিল উচ্ছ্বাস। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা শেষে স্বজনকে কাছে পাওয়ার আনন্দে কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি, কেউ আবার প্রিয়জনকে জড়িয়ে ধরে প্রকাশ করেছেন স্বস্তি ও ভালোবাসা।
মুক্তিপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন- মো. শামীম, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, আফসার উদ্দিন, ইমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার উদ্দিন রানা, আব্দুর রহিম শরীফ।
এ বিষয়ে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার জাকির হোসেন বলেন, মুক্তির যাবতীয় কাগজপত্র কারাগারে পৌঁছানোর পর যাচাই-বাছাই করা হয়। প্রক্রিয়া শেষে তাদের পর্যায়ক্রমে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।