গল্প
ছবি: গ্রাফিকস ধ্রুব নিউজ/এআই
শহরালি একটি সরকারি অফিসের পিয়ন। সে এসএসসি পাস। যাদের সঙ্গে সে পড়ত তাদের অনেকেরই খবর তার জানা। জমির উদ্দিন ছিল তার ক্লাসের ফার্স্ট বয়। এখন একটি বেসরকারি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সেকেন্ড বয় জসিম উদ্দিন একটি হাইস্কুলে শিক্ষকতা করে। শিবলীও একটি কলেজের শিক্ষক। তরিকুল পরবর্তীতে পড়াশোনায় অনেক ভালো করেছে। এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা শিক্ষক। সংবাদপত্রের পাতায় নিয়মিত লেখা ছাপা হয় তার। পঞ্চম ছিল সানজাহানা নাসরিন। সে বিসিএস এডুকেশন। একটি সরকারি কলেজে আছে। ষষ্ঠ ছিল তৃষ্ণা সরকার। উচ্চ শিক্ষা নিতে এখন আমেরিকা প্রবাসী। সেখানেই থিতু হয়ে গেছে। দেশে ফেরার লক্ষণটি নেই আর।
মাঝখানে অনেকে ঝরে গেছে জীবনের স্বাভাবিক স্রোত থেকে। পয়ত্রিশ রোল মুকাররম শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিসিএস পুলিশ হয়েছে। শহরালি নিজেও ক গ্রুপের শেষতম অর্থাৎ ষাটতম। গত ঈদের অনুষ্ঠানে পুরাতন খেরোখাতা স্মৃতিতে আবার নতুন করে ঝালাই করার কারণে স্মৃতিতে ধুসর কিছু সহপাঠীদের তথ্য সবার সামনে নতুন করে, নতুন রূপে একেবারে চকচকে হয়ে এলো সামনে। তা থেকে পুরাতন অনেকের তথ্য জানা গেল। অনেকে ক্লাসে তার সেই অবস্থান ভুলে গেছে। অনেকে সেটি নতুন করে সামনে আনতে চায় না। বর্তমান অবস্থানের সাথে সেই পুরান জীবন মোটেই যায় না। যেতে পারে না। যেমনটি ইকসালের ক্ষেত্রে হয়েছে। সে পড়াশোনা এগিয়ে নিতে পারেনি। সবাই বলতো মাথা মোটা ইকসাল। কিন্তু সে এগিয়ে গেছে অন্যদিকে। অনেক ক্ষেত্রে সে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এখন সে সরকারি দলের জেলা পর্যায়ের বড় নেতা। এসএসসি পরীক্ষাও দেয়নি। ব্যবসায় নেমে পড়েছিল এক মামার হাত ধরে। সরকারি দলের রাজনীতিতে নেমে সে এখন ভাগ্য ফেরাতে পেরেছে।
আরও পড়ুন-
ক্লাসে রঙ তামাশার পরিপূরক হিসেবে ফরিদকে ভাবতো সবাই। দিন এখন বদলে গেছে। অনেক বদলে গেছে। এখন ফরিদ বড় এক নেতা। সবাই তাকে সমীহ করে। বলা যায় সবাই তাকে তোয়াজ করে চলে।
বড় নেতার স্নেহ পাওয়া ফরিদের হাত ধরে অনেকেই রাজনীতিতে এসে ভাগ্য বদলাতে পেরেছে। তাদের জীবনে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য এসে ধরা দিয়েছে। আগের সেই ফরিদ্যা এখন তাদের প্রিয় ফরিদ ভাই।
এই যেমন ক্লাসে গাবলু মেরে থাকা সেলিম এখন পেশায় কন্ডাক্টর। এ লাইনে এসে ফরিদের সাথে পার্টনারশিপ হয়ে বেশ কামিয়েছে বিগত কয়েক বছরে। অনেকে চাকরি, বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার জন্য সেলিমের কাছে ধর্ণা দেয়। যেন একটু ফরিদকে বলে দেয়। যদি একটু ফরিদের নেক নজর হয়!
গ- গ্রুপের ব্যাড বয় খ্যাত রবিন ও শ্যামল যথাক্রমে উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান। এই গ্রুপের সালাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। খ গ্রুপের মোস্তাক, যে দুইবার এসএসসি ফেল। মাদক সংশ্লিষ্টতার অপবাদ ঘোচাতে এলাকায় প্রচুর দান-ধ্যান করে। দানবীর হিসেবে জনদরদী তকমা এখন তার দখলে।
শোনা যাচ্ছে, আগামী সংসদ ইলেকশনে এ আসনে প্রার্থী হিসেবে তার বিকল্প কেউ নেই। জনগণও তাকে চায়।এলাকার এমপি হিসেবেই চায়। এসব গুঞ্জনের মাঝেই স্থানীয় সংসদের গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়। আর ঠেকায় কে?
যথারীতি মোস্তাক এমপি নির্বাচিত হয়। আস্তে আস্তে বিভিন্ন ইউপি ইলেকশনে মোস্তাকের বন্ধুদের মধ্যে পরপর আটজন নির্বাচিত হয়। এরপর পুরনো অনেকেই কোনঠাসা হয়ে পড়ে। যেতে হয় পরিস্থিতির কারণে। মাঝখানে অনেক সময় বয়ে যায় নদীর স্রোতের মতো তরতর করে। নিক্সন মার্কেটের হাফ হাতা শার্টের বদলে কোট পরে হঠাৎ একদিন অফিসে হাজির হয় শহরালি। একদিন চোখের বাহারি চশমা ওঠে চোখে। যানবাহন হিসেবে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার শুরু হয় তার। এ সময় ফাইল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করা শহরালি এখন অফিসে আসে না বললেই চলে, বরং অফিসের প্রয়োজনে অফিস প্রধান শহরালির দ্বারস্থ হয়। এসময়ে
আশ্চর্য দৃশ্য চোখে পড়লো, অফিসপ্রধান নিজেই শহরালির গাড়ির দরজা খুলে দিচ্ছেন।
কাচুমাচু করে পিছনে সরে আসে অফিস প্রধান। যেন এমপি মহোদয়কে দিয়ে তার প্রমোশনের ব্যবস্থাটা হয়। তাই আব্দারের সুরে বলে, "আমার বিষয়টা একটু দেখবেন"।
শহরালি বলে, "সময় নেই, পরে কথা বলেন"।
আরও পড়ুন-
পাঠকের আগ্রহের জন্য লেখক তার সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পায়
শহরালির কথাবার্তা, চালচলন সবই যেন ম্যাজিকময়। আর সেই ম্যাজিকে কুপোকাত হয় জমির, জসিম সহ অনেকে। শহরের বিস্তীর্ণ এলাকাব্যাপী শহরালির প্লট ব্যবসার নতুন দিগন্তে এসে স্বপ্ন খুঁজতে আসে অনেকেই।
শহরালি ইংরেজি প্যারাগ্রাফ বাংলা করার জন্য যাদের দ্বারস্থ হত, আজ তারাই তার সাথে একটুখানি কথা বলতে চায়, একদন্ড সময় চায়। ব্যস্ত মানুষ শহরালি। তার এখন সময় কোথায়? সময় যাচ্ছে উড়ে উড়ে।
এমনই এক বিকেলের শেষ বেলা।
শহরালির দোতলার অফিসের সামনে মানুষের সাক্ষাৎ এর দীর্ঘ লাইন পড়েছে। এসবের মাঝখানে অনেকে ঘুরে। হন্যে হয়ে ঘুরে। শহরালি কাউকেই নিরাশ করে না। নতুন নতুন সুযোগের টোপ ফেলে। তার জালে আটকা পড়ে সবাই। পড়তে তো হবেই। চাকরি, প্রমোশন, দখল, প্লট বাণিজ্য, বদলি, গোপন সালিশ মীমাংসা একতরফা, কোনোটাতে নেই শহরালি? সবখানে সরব উপস্থিতি তার। অনেক অনেক হাততালি, নতুন এক জীবন, অন্যরকম পৌর মেয়রের হাতছানি আছে শহরালির সামনে। একসময় কৌশলে দলীয় পদে স্ত্রীর পদকে পাকাপোক্ত করে ফেলে। পৌর মেয়রের পদ নিরাপদ হয়ে যায় তার জন্য।
সামনে শুধু সুখের ময়ূর পেখম মেলে দেখা দেয়। নেপথের নায়ক হিসেবে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে শহরালি। এমনও সময় যায়, দেশের বাইরেই কাটে তার বেশি সময়।
আজ এই দেশে, কাল অন্য দেশে।
কখনো একা, কখনো মন্ত্রীর সফর সঙ্গী, কখনো বা সংসদদের সঙ্গে। তাকে ছাড়া অনেকের সফর যেন পূর্ণ হয় না। তা বুঝতে বাকি থাকে না অনেকের। অনেকের বুঝতে হয়। অনেকের পোস্টারে, চায়ের দোকানে কষ্ট করে তার গুরুত্ব বোঝাতে হয়।
ভ্রমণের সেসব ছবি প্রকাশিত হয় পত্রিকার পাতায়। গর্বে অনেকের বুক ফুলে ওঠে। সেই ফোলা বুক নিয়ে তারা
ছাপাখানার দিকে ছোটে।
অভিনন্দন! অভিনন্দন! অভিনন্দন!
পোস্টারে পোস্টারে অভিনন্দনের বন্যা বয়ে যায়।
তা দেখে অনেকেই খাবি খায়।
যে না খায়, তার ছবি যায় পত্রিকার পাতায় পাতায়। শহরালির সাথে ছবি।
এমন ছবি কম কথা নয়!
এইভাবে নাদের আলী, আলফুরা একদিন জননেতা হয়ে যায়। তাদেরও জনগণ চিনে ফেলে ছবি দেখে দেখে। তাদের নানান রঙের ছবি দেখে, পোস্টারে নানান বাণীর ছবি দেখে।
দেখতে দেখতে ঘটনাগুলো এত স্বাভাবিক হয়ে যায়, যেন এভাবেই হওয়ার কথা ছিল।
নেতা শহরালি।
এলাকার নেতা হিসেবে তার ভিত এভাবে মজবুত হয়।
ভিত মজবুত হয় নাদের আলী, আলফুদেরও।
শহরালির কাছে যাওয়ার ধাপ বাড়তে থাকে।
সুপারিশের সিড়ি একটু একটু করে বাড়তে থাকে।
বাড়তে থাকে কত কি?
জমি, ক্ষমতা, চোখের আড়ালে অনেক কিছু বাড়তে থাকে।
মাঘের শেষে একদিন।
এলাকার এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আলফুকে দুহাত জোড় করে ধরে অনুণয় করে মুসা মাস্টার।
তার ছেলের চাকরি যদি না হয় তবে যেন টাকাটা ফেরত দেয় শহরালি।
আর কত?
ভিটেমাটির শেষ সম্বল বেঁচে ছেলের সরকারি চাকরির যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল শহরালি তার দিন শেষ। বৃষ্টির পানির মত পরিষ্কার। এখন সরকারি চাকরি দেয়া শুধু ছলনা। দিন যতই যাচ্ছে টাকা পাওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।
যার কাছেই আলাপ করেন মাস্টার সেই শহরালির জালে বিভিন্নভাবে আটকা পড়েছেন।
"শহরালির দুই নয়ন
এলাকাবাসির উন্নয়ন"।
কিন্তু মুছা মাস্টার ভাবে, শহরালির চোখ বাস্তবে কত জনের উপর পড়েছে তার ইয়ত্তা নেই। অনেকে ভয়ে মুখ খুলছে না। টাকার অভাবে যাকে ফ্রি পড়িয়েছে, সেই তাকে ঠকিয়েছে অনায়াসে। অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায় না।
পেলেও কোনো পাত্তা দেয় না। ক্ষমতার তৈরি সামাজিক মুখোশের আড়ালে এ যে অন্য এক রূপ শহরালির। ভিন্নরূপ চেহারায় রক্ত মাংসের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ক্ষমতার অন্য চেরাগ। যা মুছা মাস্টারের কাছে পরিচিত ছিল না পূর্বে। অন্য চেহারার শহরালি কুত্তার মত তাড়িয়ে দিতে চায় মুসা মাস্টারকে। অনেকে অনেক সাগরেদ তার চারপাশে ঘুরঘুর করে সবসময়।
আজ অনেক রাগ নিয়ে এসেছিল আজ মুসা মাস্টার। হোক সে বড় নেতা। কিন্তু এককালে তো তার ছাত্র ছিল। সে সিদ্ধান্ত নেয় যে আজ ভীষণ রকম প্রতিবাদ করবে। টাকা আজই ফিরিয়ে দিতে বলবে। কিন্তু কি এক অজানা পুরানো সেই শিক্ষকসূলভ মায়া ঘিরে ধরে তাকে।
কিছুই বলতে পারে না শেষ পর্যন্ত। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে দেখে, এ যেন এক নতুন শহরালি।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে।
একেবারে আরো নতুন শহরালিকে দেখে।
ভিন্ন ভাবে দেখে।
অচেনা শহরালিকে দেখে চিনতে পারেনা আজ।
আসলে কে এ?
সেই শহরালির চোখে বিদেশ থেকে আনা নতুন সানগ্লাস।
মুছা মাস্টার তাকিয়ে শহরালির সেই সানগ্লাসে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলেন না। ক্ষমতা তাকে এমন এক স্বপ্নে নিয়ে গেছে, যেখান থেকে জেগে ওঠার সুযোগ নেই।
রুমে শ্লো ভলিউমে বাজছে এল্টন জনের বিখ্যাত গান,
"ফ্লাই অ্যাওয়ে
ফ্লাই অ্যাওয়ে"..
আরামচেয়ারে দুলছে শহরালি।
আজ গানে গানে খোয়াবে ডুবে যাচ্ছে তার চারপাশ।
যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে আরামে।
দুলছে অবিরাম হাজার বছরের পুরানো আরামে।
আর দরজার বাইরে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে মুছা মাস্টার।