Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

সময়ই শেষ পর্যন্ত লেখকের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে

সাইদ হাফিজ সাইদ হাফিজ
প্রকাশ : শনিবার, ১৩ জুন,২০২৬, ০৮:০০ এ এম
আপডেট : শনিবার, ১৩ জুন,২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম
সময়ই শেষ পর্যন্ত লেখকের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে

সাইদ হাফিজ (নিবন্ধিত নাম: আব্দুল্লাহ আল সাঈদ) বাংলাদেশের একজন তরুণ লেখক, গবেষক এবং পল্লী উন্নয়ন উদ্ভাবক। তিনি ১৯৯১ সালের ৩ জুন যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গঙ্গানন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মো. হাফিজুর রহমান এবং মাতা রোমেজা বেগম।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর উভয় ক্ষেত্রেই প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।

হাফিজ অল্প বয়স থেকেই সাহিত্যচর্চা শুরু করেন এবং ইতোমধ্যে তার তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে— বিতর্কিত (২০১০), নষ্ট মানুষ (২০১৪) এবং আতুর ঘরে আগুন (২০১৫)। এছাড়াও তিনি একাধিক সাহিত্য সংকলন সম্পাদনা করেছেন এবং তার লেখা দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ও সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তার গবেষণার আগ্রহের বিষয়গুলোর মধ্যে যশোর অঞ্চলের ভাষা আন্দোলন এবং লোকসাহিত্য অন্যতম।

সাহিত্যের পাশাপাশি হাফিজ সামাজিক উদ্ভাবন, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় নেতৃত্বেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। তিনি ‘বাংলাদেশ সামাজিক পরিষদ’ (২০০৫) এবং ‘গঙ্গানন্দপুর সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি’ (২০১৬)-এর প্রতিষ্ঠাতা।

পল্লী উন্নয়ন ও প্রায়োগিক গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৮ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন স্বর্ণপদক প্রদান করে। কচুরিপানা থেকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে তিনি ২০১৯ সালে জাতীয় পর্যায়ে একজন শীর্ষস্থানীয় তরুণ উদ্ভাবক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। লিখিত প্রশ্নের মাধ্যমে তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ধ্রুব নিউজের উপদেষ্টা সম্পাদক ড. মহিউদ্দীন মোহাম্মদ

প্রশ্ন:  “খড়ের গম্বুজ” শব্দবন্ধটি শুনলে আপনার মনে প্রথম কীসের ছবি বা স্মৃতির উদ্রেক হয়?

সাইদ হাফিজ:  “খড়ের গম্বুজ” শুনলেই আমার মনে ভেসে ওঠে এক শান্ত, স্নিগ্ধ গ্রাম—ধান কাটার মৌসুমে মাঠের কোণে সাজানো খড়ের ঢিবি, যার নিচে লুকিয়ে থাকে শৈশবের খেলাধুলা, হাসি আর নির্ভেজাল জীবনের গন্ধ। এটি কেবল একটি গ্রামীণ অনুসঙ্গ নয়, বরং এক বিস্মৃত পৃথিবীর প্রতীক—যেখানে সরলতা ছিল জীবনের প্রধান অলংকার।

প্রশ্ন:   এই তীব্র যান্ত্রিক ও নাগরিক সময়ে দাঁড়িয়ে নিজের শিকড় বা মাটির কাছাকাছি থাকাটা একজন লেখকের জন্য কতটা জরুরি?

সাইদ হা. :যান্ত্রিক সময় আমাদের গতি দেয়, কিন্তু মাটি আমাদের গভীরতা দেয়। মাটির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন লেখনী অনেক সময় শব্দে সমৃদ্ধ হলেও আত্মায় শূন্য হয়ে পড়ে।

প্রশ্ন:   আপনার লেখায় গ্রামীণ জীবন, লোকজ উপাদান কীভাবে জায়গা করে নেয়? কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতা আছে কি?

সা. হা : গ্রাম আমার সত্ত্বায় বাস করে। লোকজ উপাদানগুলো আমি খুঁজে আনি না, বরং তারা নিজেই এসে বসে পড়ে আমার বাক্যে। একবার এক বৃদ্ধের কাছ থেকে শুনেছিলাম একটি লোকগান—তার কণ্ঠে ছিল জীবনযুদ্ধের ইতিহাস; সেই অভিজ্ঞতা আজও আমার লেখায় ফিরে ফিরে আসে।

প্রশ্ন: আমরা কি ক্রমশ আমাদের ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যিক রূপগুলো হারিয়ে ফেলছি? সেই অভাব কীভাবে পূরণ করা যেতে পারে?

সা. হা : আমরা হারাচ্ছি না, বরং ভুলে যাচ্ছি। ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করতে হলে তাকে আধুনিকতার সঙ্গে সংলাপে বসাতে হবে—সংরক্ষণ নয়, পুনর্নির্মাণই এখানে মূল কাজ।

প্রশ্ন:   এমন কোনো বই বা সাহিত্যকর্মের কথা বলবেন, যা পড়ার পর আপনার মনে হয়েছে—এটি সরাসরি মাটির গন্ধ থেকে তৈরি?

সা. হা: অনেক গ্রন্থই আছে, তবে যেসব রচনায় মানুষের ঘাম, মাটি, কষ্ট আর ভালোবাসা একসাথে মিশে যায়—সেগুলোকেই আমি “মাটির গন্ধমাখা সাহিত্য” বলি। এমন সাহিত্য পড়লে মনে হয়, শব্দগুলো যেন জমিন থেকে উঠে এসেছে।

প্রশ্ন:   আপনার লেখার আদর্শ পরিবেশ কোনটি? লেখার সময় কোনো বিশেষ অভ্যাস বা অনুঘটক কি আপনাকে সাহায্য করে?

সা. হা: নিঃশব্দতা আমার সবচেয়ে বড় সহচর। গভীর রাতে শব্দেরা সহজে ধরা দেয়। লেখার আগে আমি দীর্ঘ সময় ভাবি। কখনো একটি শব্দই পুরো লেখার জন্ম দেয়; আবার কখনো একটি শব্দই কেঁড়ে নেয় পুরো একটি রাত।

প্রশ্ন:   আপনার কোনো জনপ্রিয় লেখার পেছনের এমন কোনো অজানা গল্প আছে, যা পাঠক বা দর্শকরা আগে কখনো শোনেনি?

সা. হা: আমার একটি জনপ্রিয় লেখার জন্ম হয়েছিল এক ব্যর্থতার ভেতর থেকে। যে গল্পটি পাঠকের কাছে শক্তি হয়ে উঠেছে, সেটি আসলে আমার ব্যক্তিগত দুর্বলতার প্রতিফলন ছিল।

প্রশ্ন:   লেখার শুরুর মুহূর্তের যে মানসিক লড়াই বা প্রথম লাইনটি লেখার দ্বিধা, তা আপনি কীভাবে পার করেন?

সা. হা: আমি প্রথম লাইনের জন্য অপেক্ষা করি না, বরং তাকে আমন্ত্রণ জানাই। ভুল হোক, অসম্পূর্ণ হোক—শুরুটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরে শব্দ নিজেই পথ খুঁজে নেয়।

প্রশ্ন:   একটি লেখা শেষ হওয়ার পর আপনার অনুভূতি কেমন হয়? আপনি কি নিজের লেখা নিয়ে সহজে সন্তুষ্ট হতে পারেন?

সা. হা: একটি লেখা শেষ হলে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়—যেন কিছু হারিয়ে ফেলেছি। সন্তুষ্টি খুব কমই আসে; কারণ প্রতিটি লেখা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আরও ভালো কিছু লেখা সম্ভব ছিল।

প্রশ্ন:   যদি আপনাকে আপনার নিজের যেকোনো একটি চরিত্র বা কবিতার লাইনের সাথে তুলনা করতে বলা হয়, আপনি কোনটি বেছে নেবেন এবং কেন?

সা. হা: আমি নিজেকে কোনো চরিত্র বা সম্পূর্ণ কবিতার সঙ্গে নয়, বরং একটি অসম্পূর্ণ লাইনের সঙ্গে তুলনা করবো—যেখানে অর্থ এখনও তৈরি হচ্ছে, শেষ হয়নি।

আরও পড়ুন-

কেন লিখি-সাইদ হাফিজ কেন লিখি-সাইদ হাফিজ

প্রশ্ন:  বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া এবং রিলস/শর্ট ভিডিওর যুগে মানুষের পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে কি? সাহিত্যকে এর সাথে কীভাবে মানিয়ে নিতে হবে?

সা. হা: পড়ার ধরন বদলেছে, কমে যায়নি। সাহিত্যকে আরও সংক্ষিপ্ত, তীক্ষ্ণ এবং প্রভাবশালী হতে হবে—তবে গভীরতা বিসর্জন দিয়ে নয়।

প্রশ্ন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর এই যুগে মানুষের আবেগের জায়গা থেকে মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টির ভবিষ্যৎ আপনি কেমন দেখছেন?

সা. হা: AI শব্দ তৈরি করতে পারে, কিন্তু অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে না। মানুষের বেদনা, প্রেম, দ্বন্দ্ব—এই জায়গাগুলোই সাহিত্যের চিরন্তন শক্তি।

প্রশ্ন:   সমকালীন তরুণ লেখকদের লেখার মধ্যে কোন শক্তি বা কোন সীমাবদ্ধতা আপনার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে?

সা. হা: তাদের সাহস আছে, নতুন ভাবনার তৃষ্ণা আছে। তবে কখনো কখনো তারা গভীরতার আগে গতি বেছে নেয়; যা দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্য তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

প্রশ্ন: একটি ম্যাগাজিন বা পত্রিকার ছোট পরিসরে সাহিত্যচর্চা এবং একটি আস্ত বই লেখার মধ্যে একজন লেখকের মানসিকতায় কী তফাত থাকে?

সা. হা: ম্যাগাজিনে লেখা যেন ক্ষণিকের আলোর ঝলক, আর বই লেখা হলো দীর্ঘ সময়ের ধৈর্যের সাধনা।

প্রশ্ন:   বর্তমানের সাহিত্য সমালোচনা কি তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে? একজন লেখকের মূল্যায়নে পাঠকের ভূমিকা এখন কতখানি?

সা. হা: সমালোচনা অনেক সময় প্রভাবিত হয়, কিন্তু পাঠক সবচেয়ে বড় বিচারক। তবে সময়ই শেষ পর্যন্ত লেখকের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে।

প্রশ্ন:   জীবনের শুরুর দিকের আপনার যে সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, সময়ের সাথে সাথে তাতে কী ধরণের বড় রূপান্তর বা পরিবর্তন এসেছে?

সা. হা: শুরুর দিকে আমি শব্দে মুগ্ধ ছিলাম, এখন অর্থে। আগে লিখতাম প্রকাশের জন্য, এখন লিখি উপলব্ধির জন্য।

প্রশ্ন:   একজন লেখকের কি সমাজ বা রাজনীতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকা উচিত, নাকি সাহিত্য কেবলই খাঁটি শিল্পের জন্য হওয়া উচিত?

সা. হা: সাহিত্য খাঁটি শিল্প, কিন্তু সে কখনো সমাজ বা রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একজন লেখকের নীরবতাও অনেক সময় একটি অবস্থান হয়ে ওঠে। সেটা সমাজ বা রাজনীতির প্রতি দায়বদ্ধতা ছাড়া আর কি হতে পারে?

প্রশ্ন: এমন কোনো লেখার স্বপ্ন কি আপনার আছে, যা আপনি এখনো লিখে উঠতে পারেননি কিন্তু একদিন লিখতে চান?

সা. হা: আমি একটি উপন্যাস লিখতে চাই, যেখানে শব্দ কম থাকবে, কিন্তু পাঠক অভিজ্ঞতার গভীরতা অনুভব করতে পারবে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

প্রশ্ন:   আপনার জীবনের এমন কোনো ঘটনা বা ট্র্যাজেডি আছে, যা আপনার লেখার পুরো মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল?

সা. হা: প্রতিটি হারানো, প্রতিটি ব্যথা আমাকে নতুন করে লিখতে শিখিয়েছে। কোনো একটি ঘটনা নয়—জীবনের ধারাবাহিক আঘাতই আমার লেখার পথ তৈরি করেছে।

প্রশ্ন:   “খড়ের গম্বুজ”এর পাঠক এবং নতুন প্রজন্মের সাহিত্যিকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

সা. হা: মাটির গন্ধ ভুলে যাবেন না। শব্দের ভিড়ে হারিয়ে যাবেন না। নিজের ভেতরের সত্যকে খুঁজে বের করুণ; দেখবেন তখন সাহিত্যও সত্যিকারের জীবন্ত হয়ে উঠবে।

 

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

সম্পর্কিত

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)