Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

যুদ্ধের মাঝেও বিয়ের পিঁড়িতে ইরানি তরুণ-তরুণীরা

গাজী আব্দুর রশীদ, তেহরান থেকে গাজী আব্দুর রশীদ, তেহরান থেকে
প্রকাশ : বুধবার, ২৫ মার্চ,২০২৬, ১২:০১ এ এম
যুদ্ধের মাঝেও বিয়ের পিঁড়িতে ইরানি তরুণ-তরুণীরা

যুদ্ধের ময়দানেও বিয়ের পিঁড়িতে ৫০ জোড়া তরুণ তরুণী। বসন্তের দক্ষিণা মৃদু বাতাস বইছে, সজীব হয়ে উঠেছে পত্রপল্লব। ওরা বোঝে না যুদ্ধ কী, রক্ত কী। ওরা কেবল ভালোবাসা দিতে জানে, নিতে জানে।

ওরা এফ-৩৫ কিংবা ব্যালিস্টিক মিসাইলের শব্দে ওরা ভয় পায় না তবে আঁতকে ওঠে বিকট শব্দে। ২৪ দিনে গড়ানো যুদ্ধে নিরীহ কবুতর, ঘুঘু, পথের পার্শিয়ান বিড়ালগুলোর খাবারের বড় কষ্ট হচ্ছে। বাড়ির পাশে আন্তঃনগর রেলস্টেশন র-অহানে প্রতিদিন দেখি অন্তত শ’পাঁচেক কবুতর ও ঘুঘু আর গোটাবিষেক বিড়াল খাবারের জন্য কেমন করে তাকিয়ে থাকে, বড় কষ্ট হয়। কখনো নিজে একটু আধটু খাবার দিই, অন্য কেউ কেউও দেয়।

যুদ্ধ ওদের জীবনে ক্ষুধার কষ্ট এনে দিয়েছে। বাতাসে বারুদের ঝাঁজালো গন্ধ আজ খানিকটা কম। তবে উত্তর এবং দক্ষিণ তেহরানে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণের শব্দ যেন ছুটি শেষে ফেরত আসা নগরবাসীকে জানান দিচ্ছে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ইসরাইল-আমেরিকার যুদ্ধ থেমে যায়নি।
  
আমি রাজধানী তেহরানের কথা বলছিলাম।

প্রকৃতির বসন্ত নওরোজের আজ চতুর্থ দিন। হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য ইরানিদের ফারসি নতুন বছর বা নওরোজ উৎসব। বসন্তে বাহারি উৎসবে ইরানিদের কত আনন্দ করতে দেখেছি গত ২২টা বছর ধরে। বসন্তে কখনো যুদ্ধ দেখিনি। এবার সেই উৎসব সেভাবে চোখে পড়লো না বটে, তবে একেবারে নিরানন্দ ছিল না।

নতুন বছর ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রথম পর্বের ছুটির আজ মঙ্গলবার শেষ দিন। কাল থেকে আবার শহর ব্যস্ত হয়ে উঠবে। 
নগর জীবনের কোলাহল আর কর্মজীবনের ছোটাছুটি শুরু হবে। ভাবলাম, আজ কেন ঘরে বসে থাকি? ছুটির শেষ দিনটিতে যুদ্ধ এবং নতুন ফার্সি বছরে ইরানিদের জীবন দেখতে তাই বেরিয়ে ছিলাম সেই সাত সকালে। কখনো মেট্রোতে, কখনো বাসে, কখনো বা ট্যাক্সিতে এবং পায়ে হেঁটে বলা চলে গোটা তেহরানের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত অন্তত ৬০ কিলোমিটার ঘুরে তবে ঘরে ফিরলাম। আজ কত কিছু দেখলাম। ছিল ভালোলাগার সব ছবি আবার ব্যথার ছবিও। 

সেসব কথা বলার আগে একটু যুদ্ধের খবরে যাই। ইরানের ‘সত্য প্রতিশ্রুতি-৪’ এর ৭৮তম তরঙ্গ আজ তেল আবিব, এইলাত বন্দর ও কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিতে বিধ্বংসী আঘাত হেনেছে নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র ‘এমাদ’ ও কয়েকটি ওয়ারহেড যুক্ত ‘কাদের’ নামের কয়েকটি বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ধ্বংসাত্মক আঘাতকারী কিছু ড্রোনও ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি।

এর আগে বারবার তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ইরান তার ভূমি ও সার্বভৌমত্বের ওপর যেই দেশের  যেই স্থান থেকেই হামলা করা হোক না কেন, আগের চেয়েও বেশি কঠোর ও বিধ্বংসী মাত্রায় জবাব দেবে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী প্রসঙ্গে তার দেওয়া আলটিমেটাম থেকে পিছু হটে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে। তবে ট্রাম্পের ওই কথার জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কোনো ধরনের আলোচনা ও সংলাপ হয়নি। তবে যুদ্ধ বন্ধের জন্যে কয়েকটি বন্ধু রাষ্ট্রের মাধ্যমে মার্কিন সরকার ইরানের কাছে বার্তা পাঠিয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, হরমুজ প্রণালী ও চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে ইরানের নীতি অবস্থানে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। 

এর আগে ইসমাইল বাকাই সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, মার্কিন-ইসরাইলি মিথ্যা গল্প প্রচারে হাঁপিয়ে উঠেছে বিশ্ব। তবে ট্রাম্পের আলটিমেটামকে অন্যভাবে দেখার সুযোগও আছে। সেটি ধাপ্পাবাজি নাও হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। কেউ কেউ মনে করেন ট্রাম্পের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে নিজেকে চরম গুরুত্বপূর্ণ এবং আত্ম-ইমেজের অধিকারী বলে অনুভব করা। অন্যদের কাছ থেকে সীমাহীন প্রশংসা শোনার অত্যাধিক ইচ্ছা পোষণ করা এবং অন্যদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করার ক্ষমতা না থাকা।  
আর এসব কারণে ট্রাম্পের হুমকি একটা ব্লাফ কিনা তা অনুমান করা কঠিন। একই সময়ে এই হুমকি ইরানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যাবশ্যক। অনেকটা এভাবেও বলা যায়, চোখট্যারা মানুষ যেদিকে তাকায় আসলে সেদিকে দেখে না। দেখে অন্যদিকে। তাই ট্রাম্পের আলটিমেটাম উড়িয়ে  দেওয়া একেবারে ঠিক হবে না। হয়তো আবারো কোনো শীর্ষ নেতাকে কিলিং মিশনের টার্গেট করে বসে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ডোনাল্ড ট্রাম্প কিন্তু গত মঙ্গলবার আরেকটি কথা বলেছেন। ইরান যুদ্ধের দায় নিজের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর চাপানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মেমফিসে সোমবার ‘সেফ টাস্ক ফোর্সের’ এক গোলটেবিল বৈঠকে ট্রাম্প এমনই ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, তাঁর প্রশাসনের সদস্যদের মধ্যে হেগসেথই প্রথম তাঁকে ইরানে হামলার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

২৪ দিনের যুদ্ধে জীবনের অনেক রঙ দেখা হলো। আজ প্রথমে বড় বাজারে বা বাজারে বুজর্গে গিয়ে দেখলাম প্রায় সব দোকানপাট খোলা। দরদাম জিজ্ঞেস করলাম নিত্যপণ্যের, কিন্তু দাম বাড়ার খবর নেই। নওরোজের আগে যা ছিল তাই আছে। অথচ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে গত জানুয়ারির ১২ তারিখ থেকে উত্তাল হয়ে ওঠে ইরান; বিক্ষোভ প্রতিবাদ হয়। সেই সুযোগে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী অনেককে হত্যা করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হাতেও অনেক সন্ত্রাসী নিহত হয়।
 
এরপর ভ্যালিয়সর স্কয়ার ছাড়িয়ে গেলাম অভিজাত শহর তাজরিশে। আলবোরস পর্বতমালার কোল ঘেঁষে থাকা পরিচ্ছন্ন তাজরিশ শহরের ভেতর দিয়ে আবাসিক পাড়ায় ঢুকলাম। সেখানে দেখলাম হাতে ফুলের তোড়া আর মিষ্টি নিয়ে নতুন পোশাকে অনেক সন্তান তাদের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে দরজায় কড়া নাড়ছে। প্রতিটি ইরানি বসন্ত শুরুর কটা দিনে এভাবে আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে দেখা করে আনন্দে কাটায়। নওরোজ এ এক অনুপম সংস্কৃতি ইরানিদের। এবার গেলাম পশ্চিম  তেহরানের আজাদি স্কয়ার রেখে সদেকিয়া হয়ে আরেকটি এলাকায়। বন-বনানী দিয়ে সবুজেস ঘেরা এলাকায় ফুলের মৌ গন্ধে মনটা ভরে গেল। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে যুদ্ধের কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। আর ঠিক তখনই আকাশে এক বিকট বোমার বিস্ফোরণ ঘটলো। হতচকিত হয়ে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম।

কিছুক্ষণ বসে থেকে তারপর সাবওয়ে হয়ে ঘরে ফিরলাম। কিন্তু সব বিষয়কে ছাপিয়ে যায় যে ঘটনাটি তা হচ্ছে, নববসন্ত বা নওরোজ উপলক্ষে ইরানের পবিত্র মাশহাদ নগরীতে ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে ৫০টির মত বিয়ের এনগেজমেন্ট হয়েছে এই যুদ্ধের ডামাডোলে। বর-কনে হাসিমুখে বলছে, ‘এই যুদ্ধে আমরা জীবনসাথী হতে এসেছি। এই যুদ্ধে আমাদের জয় হবে। আমরা হাসি মুখে জীবন দিতেও প্রস্তুত।’ তাদের প্রত্যাশা নতুন বছরের যুদ্ধ, ব্যথা-কষ্টের অবসান হবে। যুদ্ধ থেমে যাবে, সুন্দর নতুন সকাল আসবে এবং আনন্দময় জীবন শুরু হবে।

ধ্রুব/এস.আই

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)