Ad for sale 990 x 90 Position (1)
Position (1)
শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
Ad for sale 870 x 100 Position (2)
Position (2)

মিথ্যার অতল গহ্বর থেকে সত্যের পুনর্জন্ম

এ এ আজীম এ এ আজীম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি,২০২৬, ১০:২০ পিএম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি,২০২৬, ১০:৪৫ পিএম
মিথ্যার অতল গহ্বর থেকে সত্যের পুনর্জন্ম

মানবসভ্যতার ইতিহাস কোনো সরলরেখায় অগ্রসর হওয়া একমুখী যাত্রা নয়; বরং এটি উত্থান-পতন, গৌরব-অবক্ষয় ও পুনর্জাগরণের এক সুদীর্ঘ চক্র। এই চক্রাকার গতিশীলতাই মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। মিথ্যার অতল গহ্বরে পতন যেমন রূঢ় বাস্তব, তেমনি সেই অন্ধকার ভেদ করে সত্যের পুনর্জন্মও এক অমোঘ ঐতিহাসিক সত্য।

সভ্যতার পতন: নৈতিক অবক্ষয়ের পরিণতি

ইতিহাসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো সভ্যতার পতন কখনোই আকস্মিক ঘটে না; এটি মূলত দীর্ঘদিনের নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত ফল। চতুর্দশ শতাব্দীর প্রখ্যাত মুসলিম ঐতিহাসিক ও সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'মুকাদ্দিমা' (The Muqaddimah)-এ উল্লেখ করেছেন যে, সভ্যতার উত্থান-পতনের নেপথ্যে সামাজিক সংহতি বা ‘আসাবিয়্যা’র ভূমিকা অপরিসীম। যখন একটি জাতি নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান ও ঐক্যবদ্ধ থাকে, তখন তারা উন্নতির শিখরে আরোহণ করে। কিন্তু বিলাসিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও নৈতিক বিচ্যুতি সেই ঐক্যকে ফাটল ধরিয়ে দেয়, যার ফলে পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

অনুরূপভাবে, বিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক আর্নল্ড জে. টয়েনবি তাঁর 'এ স্টাডি অব হিস্ট্রি' (A Study of History) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, সভ্যতা যখন বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং সঠিক সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়, তখনই তার ধ্বংসের ঘণ্টা বাজে।

মিথ্যার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও সামাজিক সংকট

মিথ্যার বিস্তার সমাজে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে শুরু হয়। ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য ছোটখাটো অসত্য বা নৈতিক আপস ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। যখন রাষ্ট্রযন্ত্র, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা বা গণমাধ্যম সত্যের পরিবর্তে সংকীর্ণ স্বার্থ ও প্রভাবের অনুগামী হয়, তখন সমাজের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। সামাজিক বিশ্বাস ভেঙে পড়ে এবং এক গভীর নৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতন এর এক ধ্রুপদী উদাহরণ—যেখানে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সাম্রাজ্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল।

পুনর্জন্মের দর্শন: ধ্বংসের ভস্ম থেকে নতুনের উত্থান

ধ্বংসের ভস্ম থেকে নতুন জীবনের উদ্ভব কেবল ইতিহাসেই নয়, ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাতেও গভীরভাবে প্রোথিত। হিন্দু দর্শনের ‘যুগচক্র’ বা ভাগবত পুরাণে বর্ণিত কলিযুগের অন্ধকার শেষে সত্যযুগের আবির্ভাবের ধারণাটি এই পুনর্জাগরণেরই ইঙ্গিত দেয়। ধ্বংস কখনও চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়; বরং এটি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষা ও নতুন ভিত্তি তৈরির প্রক্রিয়া।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রতিটি বিপর্যয়ের পর নতুন প্রজন্ম অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা থেকে যেমন সম্মিলিত শান্তির তাগিদে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল, তেমনি স্বৈরশাসনের পতন বা উপনিবেশবাদের অবসান সর্বদা নতুন গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করেছে।

আধুনিক প্রেক্ষাপট ও উত্তরণের পথ

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ভ্রান্ত তথ্য (Misinformation) ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা সমাজে নতুন করে বিভাজন ও নৈতিক সংকট সৃষ্টি করছে। তবে এই একই প্রযুক্তি সত্য উদ্ঘাটনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। এটি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে মানুষের নৈতিকতা ও ব্যবহারের ওপর। পুনর্জন্মের এই প্রক্রিয়া কখনোই সহজ নয়; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষা, নৈতিক চর্চা এবং সামাজিক সংলাপ।

ইতিহাসে দাসপ্রথা বিলুপ্তি, নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা বা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মতো বড় সংস্কারগুলো প্রমাণ করে যে, মানুষ দীর্ঘকাল অন্ধকারে আবদ্ধ থাকতে চায় না। প্রকৃতির নিয়মে যেমন বনভূমি অগ্নিকাণ্ডের পর মাটিতে সুপ্ত বীজ থেকে নতুন চারা গজায়, কিংবা আগ্নেয়গিরির লাভায় পুড়ে যাওয়া ভূমি সময়ের সাথে উর্বর হয়ে ওঠে, মানবসভ্যতাও তেমনই ধ্বংসের ভেতর থেকেই পুনর্গঠনের সম্ভাবনা খুঁজে পায়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, মিথ্যার অতল গহ্বরে পতন মানবজাতির জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা, কিন্তু তা কখনোই শেষ কথা নয়। ইতিহাস ও দর্শনের পাতায় এটি স্পষ্ট যে—পতনের পরই আসে পুনর্জন্ম। ধ্বংসের বীজ থেকেই জন্ম নেয় সেই নতুন প্রজন্ম, যারা সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার ভিত্তিতে পুনরায় সমাজ বিনির্মাণে সচেষ্ট হয়। মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা সর্বদা সত্যের দিকে; আর এই আকাঙ্ক্ষাই তাকে বারবার জাগিয়ে তোলে। মিথ্যার অতল গহ্বর তাই যবনিকা নয়, বরং সত্যের পুনর্জন্মের এক অনিবার্য পূর্বভূমিকা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

ধ্রুব নিউজের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

💬 Comments

Login | Register
Ad for sale 270 x 225 Position (3)
Position (3)
Ad for sale 990 x 90 Position (4)
Position (4)