ধ্রুব ফিচার
ছবি: প্রতীকী
পবিত্র রমজান মাসে আবহাওয়া যখন পরিবর্তনশীল থাকে, তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সুস্থ থেকে পুরো মাস ইবাদত করতে প্রয়োজন একটি বিজ্ঞানসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস। ইফতারের আয়োজনে বর্তমানে দই-চিড়া সেরা খাবার হিসেবে স্বীকৃত। চিড়া কার্বোহাইড্রেটের অন্যতম উৎস এবং দই একটি প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিক, যা দুধ থেকে তৈরি হয় বলে এতে গুরুত্বপূর্ণ আমিষ ও পুষ্টি উপাদান থাকে। ইফতারের শুরুতে একটি বা দুটি খেজুর খাওয়া উচিত, যা পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়। এরপর মূল খাবার হিসেবে দই-চিড়া বেছে নিলে খুব দ্রুত এনার্জি পাওয়া যায়, অথচ এতে ক্যালরির মাত্রা অনেক কম। দইয়ের উপকারী ব্যাকটেরিয়া আমাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং দীর্ঘ সময় রোজা রাখার পর পাকস্থলীকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে সাদা চিড়ার বদলে লাল চিড়া বেছে নিলে এতে থাকা আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বাড়তে দেয় না। সারা দিনের কর্মব্যস্ততায় দেহের যে ক্ষয় হয়, দইয়ের প্রথম শ্রেণির আমিষ তা পূরণে দারুণ কার্যকর। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে এতে চিনি বা গুড় যোগ না করে কেবল সামান্য লবণ অথবা পছন্দের কলা বা অন্যান্য মৌসুমি ফল মিশিয়ে নেওয়া বেশি স্বাস্থ্যকর। দই-চিড়া তৈরির কোনো ঝামেলা নেই বলে এটি অফিস বা কর্মস্থলেও অনায়াসে ইফতার হিসেবে গ্রহণ করা যায়।
বাঙালি ইফতার টেবিলের আরেক পরিচিত উপাদান মুড়ি নিয়ে আমাদের বিশেষ সচেতনতা প্রয়োজন। মুড়ি দ্রুত শক্তি দিলেও এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অত্যন্ত বেশি অর্থাৎ প্রায় ১০৫, যা রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বাড়িয়ে দেয়। তাই মুড়ি খেতে হবে পরিমিত পরিমাণে এবং এর সাথে অবশ্যই প্রোটিনজাতীয় খাবার যেমন ছোলা বা বাদাম এবং ফাইবার সমৃদ্ধ সালাদ মিশিয়ে নিতে হবে। ডুবো তেলে ভাজা পিঁয়াজু, বেগুনি বা আলুর চপ ইফতারের স্বাদ বাড়ালেও এগুলো হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং বুকজ্বালার প্রধান কারণ। তাই ভাজাভুজি বর্জন করে অঙ্কুরিত ছোলার সাথে শসা-টমেটো অথবা দই-চিড়া বা ওটস খাওয়া অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত। পুষ্টির বিচারে মুড়ির চেয়ে পপকর্ন বেশি এগিয়ে থাকলেও দেশি আমেজে মুড়িকে স্বাস্থ্যকর করতে এর সাথে পর্যাপ্ত সালাদ ও প্রোটিনের সমন্বয় অপরিহার্য। অনেকেই রাতের খাবার বাদ দিয়ে সরাসরি সাহ্রি করেন, যা স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও ভালো নয়। রাতের খাবার হবে হালকা ও সহজপাচ্য, যেমন লাল আটার রুটি বা ভাত এবং সাথে মাছ, মাংস বা সবজি। এই সময়েও এক কাপ টক দই খেলে তা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ পুনর্গঠনে ও হজমে চমৎকার কাজ করে।
সাহ্রির খাবার হতে হবে অন্যান্য সময়ের দুপুরের খাবারের সমপরিমাণ। বেশি খেলে সারাদিন ক্ষুধা লাগবে না—এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল, কারণ খাবার চার-পাঁচ ঘণ্টা পর পাকস্থলী থেকে অন্ত্রে গিয়ে হজম হয়ে যায়। সাহ্রির প্লেটের অর্ধেকটা থাকা উচিত মিশ্র সবজি দিয়ে ভরা, আর বাকি অর্ধেক শর্করা ও প্রোটিন। শেষ সময়ে এক গ্লাস কুসুম গরম দুধ বা দই-চিড়া খেলে দীর্ঘক্ষণ শরীরে শক্তির জোগান থাকে এবং তৃষ্ণা কম অনুভূত হয়। মনে রাখবেন, রমজান মানেই সংযম; খাবারের ক্ষেত্রে এই পরিমিতিবোধ ও দই-চিড়ার মতো সহজপাচ্য খাবারের নির্বাচন আপনাকে পুরো মাস সতেজ ও রোগমুক্ত রাখতে সাহায্য করবে। দিনের কর্মব্যস্ততায় নিজেকে উদ্যমী রাখতে এই সহজ অথচ পুষ্টিগুণে ঠাসা খাবারগুলোর কোনো বিকল্প নেই।