ফিচার ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ভালোবাসার কথা এলে মানুষের মুখে মুখে ফেরে যাদের নাম, তাদের এক জুটি চণ্ডীদাস-রজকিনী। কবির ভাষায়, 'চণ্ডীদাস আর রজকিনী- তারাই প্রেমের শিরোমণি, বারো বছর বরশি বাইল তবু আধার গিললো না'। উপকথা আর সত্যের সীমারেখা ডিঙিয়ে শোনা যায় এক বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাস আর ধোপাকন্যা রামীর কথা। 'রজকিনী' শব্দের অর্থও দাঁড়ায় 'ধোপাকন্যা'। ব্রাহ্মণসন্তান চণ্ডীদাস প্রেমে পড়লেন ধোপাকন্যা রামীর। জাতপাতের চিন্তা না করেই চলে তাদের প্রেম। অবশ্য প্রেম কি কোনোকালে জাতপাতের পরোয়া করে? যে ঘাটে রজকিনী কাপড় ধুতে আসতেন, চণ্ডীদাস প্রতিদিন নিয়ম করে সেখানে মাছ ধরতে যেতেন। এক যুগ ধরে শুধু এই অপেক্ষাই। কথা নেই, বার্তা নেই। নিজে থেকে চণ্ডীদাস কখনো আলাপ জুড়ে দেননি, তবে রজকিনীও হয়তো বুঝতেন— তার জন্যই প্রতিদিন এসে ধরনা দিচ্ছেন এই কাব্যমনা মানুষটি। দীর্ঘ ১২টি বছর পর একদিন সেই রজকিনী শুধোলেন, 'বড়শিতে কী মাছ ধরলা?' চণ্ডীদাস মুখ তুলে উত্তর দিলেন, '১২ বছর পর এইমাত্র ঠোকর দিল।'
অপেক্ষার ফল সুমিষ্ট হয়, কথাটা ফলে গেল আবারও।সেই থেকে শুরু তাদের পরিচয় কিংবা প্রেমালাপের। খুব স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন সমাজব্যবস্থা তাদের এই 'অসম' প্রেমকে মেনে নেয়নি। বহু অপমান-অপবাদের শিকার হতে হয়েছে, বিশেষ করে চণ্ডীদাসকে, কেননা তিনিই ছিলেন তথাকথিত উঁচু শ্রেণির বাসিন্দা। তার পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও অস্বীকৃতি জানায় সেখানকার ব্রাহ্মণসমাজ। এসব কিছুর পরও অবশ্য নিজের সঙ্গীর কাছ থেকে দূরে সরেননি তিনি। বিপদে-আপদে একসঙ্গেই থেকেছেন। শেষমেশ রামী, পরবর্তীতে 'রজকিনী' নামেই অধিক পরিচিত সেই নারীটিকে তার সাধনসঙ্গিনী হিসেবে মেনে নিতে একপ্রকার বাধ্য হয় সবাই।

চণ্ডীদাস-রজকিনীর স্মৃতি বিজড়িত ঘাট সংগৃহীত
যে ঘাটে এই অমর প্রেমের সৃষ্টি, সেই ঘাটটির অবস্থান মাগুরার শালিখা উপজেলার শতখালী ইউনিয়নের ধোপাখালী গ্রামে। প্রায় সাতশত বছরের পুরোনো প্রেমকাহিনির স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি আজও আছে। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে নদীর গতিপথ, হারিয়েছে পুরোনো ঘাটের চেহারা। তাছাড়া চণ্ডীদাস-রজকিনীর স্মৃতিবিজড়িত কথিত ঘাট ও আশপাশের স্থান দীর্ঘদিন ধরে অযত্নেই পড়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব যাচাই করে স্থানটি সংরক্ষণ করা হোক এবং সেখানে গড়ে তোলা হোক দৃষ্টিনন্দন ঘাট, স্মৃতিফলক ও পর্যটনকেন্দ্র।
মাগুরা জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে, আর যশোর শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার উত্তরে শালিখা উপজেলার ধোপাখালী গ্রাম। স্থানীয়দের কাছে এলাকাটি চণ্ডীদাস-রজকিনী ঘাট ও ‘দুয়া’ নামে পরিচিত। তাদের ভাষ্য, এই স্থানকে ঘিরেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত রয়েছে চণ্ডীদাস ও রজকিনীর প্রেমের কাহিনি।
স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, জাতপাত ও সামাজিক বাধার কারণে তারা এলাকা ছেড়ে ভারতের বাঁকুড়া জেলার ছাতনায় চলে যান। পরে তাদের বৃন্দাবনে যাওয়ার কথাও লোকমুখে শোনা যায়। এরপর তাদের জীবনের ধারাবাহিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায়নি।
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি চণ্ডীদাসের পরিচয় ও জীবনী নিয়েও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। চণ্ডীদাস নামে একাধিক কবির উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে ধোপাখালীর চণ্ডীদাস-রজকিনীর প্রেমকাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা কতটা এবং কোন অংশ লোককথা— তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে স্থানীয় মানুষের কাছে এই কাহিনি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ একটি লোকঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত।
তাদের ভাষ্য, বাপ-দাদার কাছ থেকে তারা ছোটবেলা থেকেই চণ্ডীদাস-রজকিনীর গল্প শুনে আসছেন। কথিত চণ্ডীদাস-রজকিনী ঘাটের আগের সেই পরিবেশ আর নেই। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে নদীর গতিপথ। একসময়কার নদী ও ঘাটের জায়গায় এখন জলধারা ও নিচু জমি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে ‘দুয়া’ নামে পরিচিত স্থানটিকেই চণ্ডীদাসের কথিত মাছ ধরার স্থান হিসেবে দেখানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চণ্ডীদাস-রজকিনীর প্রেমকাহিনি ইতিহাসের কতটা এবং লোকশ্রুতির কতটা— তা গবেষণার মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, গবেষণার ফল ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে স্থানটি সংরক্ষণ করা হলে নতুন প্রজন্ম এই লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। তাদের প্রত্যাশা, হারিয়ে যাওয়ার আগেই চণ্ডীদাস-রজকিনীর স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেবে প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।