ধ্রুব ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
সেদিনের সকালটা ছিল অন্য সব দিনের মতোই। নিউ ইয়র্কে মানুষ কাজে যাচ্ছিল, রাস্তায় ছিল স্বাভাবিক ব্যস্ততা। দিনের কাজকর্ম কেবল জমে উঠছিল। ৮টা ৪৬ মিনিটে হঠাৎ একটি উড়োজাহাজ বদলে দিল সবকিছু।
আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হানার ঠিক ১৭ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ আছড়ে পড়ে দক্ষিণ টাওয়ারে। চোখের নিমেষে কোটি কোটি মানুষের চোখ চলে যায় টেলিভিশনের পর্দায়। স্তম্ভিত বিশ্ব তখনো বুঝে উঠতে পারছিল না ঠিক কী ঘটছে।
এরপর আসে তৃতীয় আঘাত। সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে ওয়াশিংটনের পেন্টাগনে আছড়ে পড়ে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৭৭। আর চতুর্থ উড়োজাহাজ, ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৯৩-এর যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললে সকাল ১০টা ৩ মিনিটে সেটি পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের এক মাঠে বিধ্বস্ত হয়। ধারণা করা হয়, এর লক্ষ্য ছিল ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল ভবন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের (৯/১১) সেই হামলায় ১৯ জন ছিনতাইকারীসহ চারটি উড়োজাহাজের ২৪৬ জন আরোহী নিহত হন। সব মিলিয়ে বিশ্বের ৯০টি দেশের ২ হাজার ৯৭৭ জন প্রাণ হারান। পার্ল হারবার ট্র্যাজেডির পর এটিই ছিল আমেরিকার মাটিতে ঘটা সবচেয়ে প্রাণঘাতী আঘাত। ধসে পড়া টুইন টাওয়ার, আগুন জ্বলা পেন্টাগন এবং নিউ ইয়র্কের আকাশের কালো ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ব দেখেছিল—বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রটির নিরাপত্তাব্যবস্থা কীভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
কিন্তু ২৫ বছর পর এসে প্রশ্ন উঠছে—সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে যে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু হয়েছিল, তা এই পৃথিবীকে কতটা নিরাপদ করতে পেরেছে? নাকি আমেরিকা নিজেই নিজের পাতা দীর্ঘ যুদ্ধের ফাঁদে আটকে গেছে?
প্রতিশোধের আগুন থেকে ‘অনন্ত যুদ্ধ’
৯/১১-এর হামলার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—হামলার পরিকল্পনাকারী আল-কায়েদাকে ধ্বংস করা এবং ওসামা বিন লাদেনকে বিচারের মুখোমুখি করা। আফগানিস্তানের তালেবান সরকার বিন লাদেনকে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানালে ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হয় ‘অপারেশন এন্ডিওরিং ফ্রিডম’।
খুব দ্রুতই তালেবান সরকারের পতন ঘটে। কিন্তু আল-কায়েদাকে ধ্বংসের অভিযান ধীরে ধীরে রূপ নেয় একটি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলে দেওয়ার পশ্চিমা প্রকল্পে। দুই দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় ও হাজারো সেনার প্রাণের বিনিময়ে যে সরকারকে ওয়াশিংটন টিকিয়ে রেখেছিল, ২০২১ সালের অগাস্টে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। সেনা প্রত্যাহারের পরপরই বিপুল শক্তি নিয়ে কাবুলের ক্ষমতায় ফেরে সেই তালেবান। রিচার্ড হ্যাস ও লি হংমেই-এর মতে, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে পরিবর্তন করার চেষ্টার ফলেই তৈরি হয়েছে মার্কিন ইতিহাসের এই অন্যতম বড় কৌশলগত ও সামরিক ব্যর্থতা।
ইরাক আগ্রাসন ও নতুন চরমপন্থার জন্ম
৯/১১-পরবর্তী ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অধ্যায়টি লেখা হয় ২০০৩ সালে। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা অজুহাতে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করতে ইরাকে আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
ইরাকি সেনাবাহিনী ও প্রশাসন ভেঙে দেওয়ার ফলে দেশটিতে যে চরম নৈরাজ্য ও শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তার জঠর থেকেই জন্ম নেয় আরও ভয়ংকর জঙ্গিবাদী সংগঠন—ইসলামিক স্টেট (আইএস)। অথচ ৯/১১-এর হামলার সঙ্গে ইরাক বা সাদ্দাম হোসেনের কোনো সম্পৃক্ততাই ছিল না। একটি জঙ্গি সংগঠনকে নির্মূল করার নামে শুরু হওয়া যুদ্ধের ভেতর দিয়েই উন্মেষ ঘটে নতুন এক চরমপন্থার।
আল-কায়েদা বনাম আধুনিক সন্ত্রাসবাদ: পাল্টে যাওয়া ভূগোল
২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কড়া নজরদারি, আধুনিক সীমান্ত নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা তৎপরতার কারণে ৯/১১-এর মতো বিশাল মাত্রার কোনো হামলা পশ্চিমা বিশ্বে আর ঘটেনি।
তবে সশস্ত্র সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি এবং গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স-এর সাম্প্রতিক উপাত্ত বলছে, সন্ত্রাসবাদ ধ্বংস হয়নি; বরং তার ভৌগোলিক বিস্তার ঘটেছে। কেন্দ্র এখন পশ্চিম এশিয়া থেকে সরে গিয়ে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে (বুরকিনা ফাসো, মালি, নাইজার) স্থানান্তরিত হয়েছে। আল-কায়েদা ও আইএসের বিভিন্ন স্থানীয় শাখা এখন ছড়িয়ে পড়েছে আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায়। ২০০১ সালের একক শত্রুর বিপরীতে ২০২৬ সালের শত্রু ছড়িয়ে পড়েছে বহু নামে ও নানা চেহারায়।
যুদ্ধের মানবীয় মাশুল ও অভ্যন্তরীণ ক্ষত
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রজেক্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৯/১১ পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। সরাসরি সংঘাত ও রক্তক্ষয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ লাখের বেশি মানুষ, আর বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অন্তত ৩ কোটি ৮০ লাখ।
এই যুদ্ধের মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়নি; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতেও বড় ক্ষত তৈরি করেছে। বিদেশে দীর্ঘস্থায়ী ও অকার্যকর সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে তৈরি হওয়া অনীহা দেশটির রাজনীতিতে চরম মেরুকরণ ও জনতুষ্টিবাদের উত্থানে জ্বালানি জুগিয়েছে।
একই সঙ্গে, ৯/১১ পরবর্তী বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের ওপর নেমে আসে ঘোর অমানিশা। এফবিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাজনিত অপরাধ এক লাফে বেড়ে যায় ১৬১৭ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে ইসলামফোবিয়াকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচনে ফায়দা তোলার অপচেষ্টাও দেখেছে বিশ্ব, যার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত ‘মুসলিম নিষেধাজ্ঞা’র মাধ্যমে।
সিকি শতাব্দীর হিসাব: কী পেল বিশ্ব?
৯/১১-এর সময় বিশ্ব ছিল একমেরুকেন্দ্রিক—যুক্তরাষ্ট্র ছিল একক পরাশক্তি। কিন্তু ওয়াশিংটন যখন আফগানিস্তান ও ইরাকের মরুভূমিতে ট্রিলিয়ন ডলারের যুদ্ধে আটকে ছিল, ঠিক তখনই ঘটেছে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান। পাশাপাশি রাশিয়াও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকে পুনর্প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)-এর ১৫টি দেশের বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে উঠে এসেছে—৯/১১ পরবর্তী সামরিক প্রতিক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
গ্রাউন্ড জিরোর ধ্বংসস্তূপ সরে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি হয়েছে, নিউ ইয়র্কের আকাশ ‘নিরাপদ’ হয়েছে ঠিকই; কিন্তু যুদ্ধের প্রকৃতি বদলে গেছে। ২৫ বছর পর ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন যখন নতুন এক দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনার মুখোমুখি, তখন ঐতিহাসিক সেই প্রশ্নটি আবারও সামনে আসছে—লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে লড়া এই ‘অনন্ত যুদ্ধ’ কি সত্যিই বিশ্বকে নিরাপদ করতে পেরেছে, নাকি যুক্তরাষ্ট্র নিজেই আটকে পড়েছে নিজের পাতা ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্তের ফাঁদে?