বিশেষ প্রতিবেদক
ছবি: সংগৃহীত
সংসদ ভবন থেকে সচিবালয়, সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারক—কোথাও মিলছে না ব্যক্তিগত ডিজিটাল তথ্যের ন্যূনতম সুরক্ষা। একের পর এক সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এমপিদের মুঠোফোন নম্বর হ্যাক ও ডিজিটাল জালিয়াতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
চিফ হুইপ জানান, সংসদ সদস্যদের মুঠোফোনের গোপন ডেটা চুরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তি ব্যবহার করে কণ্ঠস্বর নকল (ভয়েস ক্লোনিং) এবং ভুয়া নথিতে জাল সইয়ের মাধ্যমে একদল প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, "গতকাল আমার কাছে ৩ জন এমপির নম্বর থেকে জরুরিভিত্তিতে ৫০ হাজার, ৩০ হাজার ও ২৫ হাজার টাকা পাঠানোর খুদে বার্তা আসে। বার্তা পেয়ে আমি সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নম্বরে কল দিলে কেউ ফোন ধরেননি। পরে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাদের নম্বরগুলো হ্যাক করা হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "ক্ষমতার সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল—সব পক্ষের সংসদ সদস্যরা এই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে আমাদের চরম সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আমরা যদি সতর্ক হই এবং এটি টেলিভিশনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তবে সারা দেশের মানুষ সচেতন হতে পারবে।"
এ সময় ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল হস্তক্ষেপ করে বলেন, "চিফ হুইপ যে ইস্যুটি তুলেছেন, সে বিষয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রাথমিক ও মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ওপর দায় না চাপিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নির্বাহী বিভাগকে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।" জবাবে চিফ হুইপ জানান, সমস্যা সমাধানে ইতিমধ্যেই বিটিআরসি (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) প্রতিরোধমূলক আইনি ও প্রযুক্তিগত কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি সংসদে প্রবেশের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লবিগুলোতে স্থাপন করা ডিভাইস ব্যবহার করে সব সদস্যের ফেস-রিকগনিশন বাধ্যতামূলক করার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদে যখন এমপিদের নিরাপত্তা নিয়ে তোলপাড়, ঠিক তখনই সামনে এসেছে দেশের মানুষের কল ইতিহাস ও অবস্থানের তথ্য অনলাইন হাটে খোলাবাজারে বিকিকিনি হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশে যে কেউ টাকা দিলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাতে পেয়ে যাচ্ছেন যেকোনো ব্যক্তির কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর)। গত ৬ সেপ্টেম্বর একজন ব্যক্তিগত ফোন নম্বর একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে নির্দিষ্ট ফি পাঠানো হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যায় তার গত ৩ মাসের পূর্ণাঙ্গ সিডিআর।
পরদিন ৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে সেই তালিকার সত্যতা যাচাই করা হলে, মন্ত্রী নিজেই তার নিজের মুঠোফোনের কল হিস্ট্রির সাথে সব মিলিয়ে দেখে আতঙ্ক ও বিস্ময় প্রকাশ করেন। বিমোহিত হওয়ার বদলে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, "এটা কীভাবে সম্ভব! যদি এভাবে গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যায়, তাহলে তো দেশের কোনো মানুষই নিরাপদ নয়।"
একইভাবে তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতের দুই শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা এবং কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সিডিআর সংগ্রহ করে শতভাগ নির্ভুল পাওয়া গেছে। বাজারদর বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, মাত্র ১,০৫০ টাকায় মিলছে ৩ মাসের সিডিআর এবং ১২০০ টাকায় ৬ মাসের সিডিআর। আর পেমেন্ট করার মাত্র ১৬ মিনিটের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে নির্দিষ্ট ব্যক্তির বর্তমান অবস্থান (গুগল ম্যাপ লিংক)।
তথ্য যাচাইকারী সংস্থা 'ডিসমিসল্যাব' ও সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং টেলিগ্রাম অ্যাপ ব্যবহার করে অন্তত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট ও ৬০০টির বেশি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে প্রতিদিন এসব সংবেদনশীল তথ্য লেনদেন হচ্ছে।
এই তথ্য বাজারে কেনাবেচা হওয়া তালিকার মধ্যে রয়েছে,
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি): ছবি, মা-বাবার নাম, ঠিকানা ও ডিজিটাল স্বাক্ষরসহ এনআইডির সাইন কপি (দাম ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা)।
কল রেকর্ড (সিডিআর): কখন, কাকে কল করা হয়েছে, কতক্ষণ কথা হয়েছে, ব্যবহৃত ফোনের আইএমইআই (IMEI) নম্বর এবং ফোর-জি/টু-জি নেটওয়ার্ক তথ্য।
মোবাইল টাওয়ার ভিত্তিক লোকেশন: রিয়েল-টাইমে ব্যক্তি কোন টাওয়ার এলাকার অধীনে আছেন তার সূক্ষ্ম গুগল ম্যাপ ডিরেকশন।
অন্যান্য নথি: পাসপোর্টের এসবি কপি, টিআইএন সনদ, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্টের বিবরণী ও এনআইডি কপি (১,০০০ থেকে ৪,৫০) টাকা)।
বিক্রি প্রক্রিয়াটি চলে ধাপে ধাপে। খুচরা বিক্রেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেয়। ক্রেতার কাছ থেকে বিকাশ বা নগদে টাকা নিয়ে তারা মূল ওয়েবসাইট পরিচালনা করা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছ থেকে কম দামে তথ্য কিনে বেশি দামে সরবরাহ করে। চাঁদপুর কেন্দ্রিক এক খুচরা বিক্রেতা স্বীকার করেছেন, তিনি ৮০০ টাকায় তথ্য কিনে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেন।
উৎস কোথায়: নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ ছিদ্র
অপারেটর সূত্রে জানা যায়, দেশে ১৯ কোটির বেশি মুঠোফোন গ্রাহকের সিডিআর ও লোকেশনের প্রাথমিক ডেটা সংরক্ষণের আইনি বাধ্যবাধকতা তাদের রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী বিটিআরসি, এনটিএমসি, পুলিশ সদর দপ্তরসহ সরকারের ১২টি আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে এই ডেটাবেজে সরাসরি বা অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় প্রবেশের সুবিধা দিতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ লগইন আইডি ও পাসওয়ার্ড হাতবদল অথবা এপিআই (API) এর মাধ্যমে সরকারি ডেটাবেজের নিরাপত্তাবেষ্টনী ডিঙিয়ে অপরাধীরা এসব স্পর্শকাতর তথ্য বের করে নিচ্ছে। গত ২০২৪ সালেই র্যাবের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও পুলিশের এক পুলিশ সুপারের পাসওয়ার্ড চুরি করে সাইবার অপরাধীদের কাছে কল রেকর্ড বিক্রির অভিযোগে এক কনস্টেবলকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এই অপব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, "ব্যক্তিগত যোগাযোগ মানুষের মৌলিক অধিকার। কোনো অপরাধী চক্র ১ হাজার টাকায় সিডিআর ও লোকেশন কিনে যে কারো ওপর নজরদারি চালাতে পারে বা অপহরণ ও ব্ল্যাকমেইলের মতো অপরাধে ব্যবহার করতে পারে।"